Showing posts with label Articale. Show all posts
Showing posts with label Articale. Show all posts

Saturday, June 4, 2022

একজন গৃহিনী কেন এতটা বন্দী? ✒️✒️ফারহানা হৃদয়িনী

 একজন গৃহিনী কেন এতটা বন্দী?





✒️✒️ফারহানা হৃদয়িনী 

কেন একজন গৃহিনী মুক্তো আকাশে বিচরণ করতে পারেনা? কেন সে শুধু মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে চলার স্বপ্নই দেখে যায়? আমাদেরও নিজের জীবনে সমাজ ও দেশ নিয়ে অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হয়,  কিন্তু আমরা গৃহিনী তাই সামাজিক বেড়াজালে বন্দী।  আমরা জীবনে আমাদের নিজের জন্য কোন সময় নাই। নিজের জীবনের উপর নিজের কোন স্বাধীন অধিকার নাই কারন আমরা স্বাবলম্বী নই। আমরা গৃহিনীরা জীবনের প্রতিটা সময় গৃহের পিছনে দিয়ে দেয় কিন্তু আমাদের সেই শ্রমের কোন মূল্যায়ন নাই। কোথাও ফর্ম পূরণ করতে যেয়ে আমরা লিখি পেশা গৃহিনী। এমন একটি পেশা যার কোন বেতন নাই, যাদের আপন কোন অধিকারের ঠিকানা নাই,  তাই গৃহিনী নামক পেশার মানুষরা পরিবার সমাজ এবং দেশে কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনা। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় গৃহিনীরা ফকিরের চাইতেও বড় বেশি ফকির। তাদের জীবনের প্রতিটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য তাদের অন্য কারো দয়ার উপর নির্ভর করতে হয়। আর এই গৃহিনী যখন নিজের যোগ্যতায় কিছু করার চেষ্টা করে তখন তার নিজের পরিবারই তার পায়ে শেকল পরানোর জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। তখন তাদের সামনে একটি প্রশ্ন থাকে তুমি সংসার নাকি ক্যারিয়ার চাও?

Friday, February 25, 2022

ভাষা আন্দোলনের সে সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা । (সংক্ষেপে)

ভাষা আন্দোলনের সে সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা । (সংক্ষেপে) 


নাছরিন আক্তার

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ‘বাংলা’ নাকি ‘উর্দু’—কী হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিষয়টি পূর্ব বাংলার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত প্রশ্নে রূপ নেয়। তখনকার সংবাদপত্রে এই বিতর্কের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সংবাদপত্রগুলো পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সংবাদ প্রকাশ করে ভাষার ইস্যুটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। 


এ সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুসলিম লীগ-সমর্থক পত্রিকাগুলোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রসঙ্গে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়। বাংলা ভাষার পক্ষে তখন প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে দৈনিক ইত্তেহাদ। দৈনিক আজাদও বাংলা ভাষার সমর্থনে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপায়।

প্রথম থেকেই মর্নিং নিউজ বাংলা ভাষার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে পত্রিকাটিতে অব্যাহতভাবে। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও খবর প্রকাশিত হতো। ১৯৪৭ সালে ১৭ ডিসেম্বর মর্নিং নিউজের সম্পাদকীয় কলামে উর্দু-সমর্থকদের একটি তাত্ত্বিক বক্তব্য প্রকাশিত হয়।


পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের একচোখা নীতির বিষয়ে তমদ্দুন মজলিসের কয়েকজন নেতা তৎকালীন মন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। মন্ত্রী এসব বিষয়কে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে দায় এড়ান। তাঁর এই বক্তব্যের ওপর ইত্তেহাদ ‘ভুলের পুনরাবৃত্তি’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।


১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার দাবি তোলেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি অমৃত বাজার পত্রিকা এই খবর প্রকাশ করে।


১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দিন বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে। তাঁর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সম্পাদকীয়র বক্তব্য বাংলা ভাষার পক্ষে পত্রিকাটির জোরালো সমর্থন নির্দেশ করে। কিন্তু একই বছর মার্চ মাসে ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রিকাটি সর্বতোভাবে উর্দুকেই সমর্থন করে।


কয়েকটি পত্রিকা সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দিতে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদে ‘ইনসাফ’, ‘জিন্দেগী’ ও ‘দেশের দাবী’ পত্রিকা থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়।


১৯৫১ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস উপলক্ষে সংগ্রাম পরিষদের পুরোনো কমিটি পুনর্গঠন করে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ৩০ দিনের জন্য শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। 


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালেই ছাত্রছাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।  একপর্যায়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা আসে। স্লোগান ওঠে, ‘১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন একদল ছাত্রছাত্রী। এরপর দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। বিকেলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ছাত্রজনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট পুলিশ। শহীদ হন সালাম-বরকত-রফিকসহ নাম না-জানা অনেকেই।


২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনার পর ভাষার প্রশ্নে আগের রহস্যের জাল ছিন্ন করে দৈনিক আজাদ। এদিন সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করে বিশেষ টেলিগ্রাম। ব্যানার হেডলাইন করা হয়, ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। মুসলিম লীগ সরকার দৈনিক আজাদের এই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরবর্তী কয়েক দিন দৈনিক আজাদ প্রচুর সংবাদ ছাপে। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা নেয়।


মর্নিং নিউজ ছিল উর্দু ভাষার সমর্থক। পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উগ্র প্রচারণা চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকেও তারা বিকৃত করে ২২ ফেব্রুয়ারি খবর প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে অবস্থিত মর্নিং নিউজের প্রেস ও অফিস জ্বালিয়ে দেয়। 


সংবাদে কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিকই ছিলেন বাংলা ভাষার সমর্থক। কিন্তু মালিকানার কারণে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির খবরও পত্রিকাটি খুব কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ জনতা রথখোলা মোড়ে সংবাদ অফিসে হামলা চালায়। ভাষা আন্দোলনবিরোধী ভূমিকার জন্য পত্রিকাটি থেকে তরুণ সাংবাদিক মুস্তফা নূরউল ইসলাম ও ফজলে লোহানী পদত্যাগ করেন।

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন খবর পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতো। এ কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবজারভারের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সম্পাদক আবদুস সালাম ও মালিক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।


সাপ্তাহিক সৈনিক ২১ ফেব্রুয়ারি বের করে বিশেষ সংখ্যা। পত্রিকাটি লাল কালিতে ব্যানার করে, ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ’। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ সৈনিক অফিস ঘেরাও করে। সম্পাদক আবদুল গফুর ও প্রকাশক প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়।


ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক ইনসাফ ও দৈনিক আমার দেশ। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় দৈনিক মিল্লাত ব্যানার শিরোনাম করে: ‘রাতের আঁধারে এত লাশ যায় কোথায়?’। ঘটনার পর মিল্লাত সম্পাদক মো. মোদাব্বেরের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ভাষা আন্দোলনে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকও জোরালো ভূমিকা পলন করে।

Friday, February 11, 2022

বঙ্গবন্ধু উপাধি (ফারহানা হৃদয়িনী)

 বঙ্গবন্ধু উপাধি 

📝ফারহানা হৃদয়িনী




ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্বর্ণখচিত নাম, ইতিহাসের এক আলোকিত মহামানব  শেখ মুজিবুর রহমান। যে নামটি বাঙালীর হৃদয়ে, বাঙালীর রক্তে, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা হয়ে মিশে গেছে। বিশ্বের ইতিহাসে যার সাহস ও বীরত্বের গাঁথা চিরকাল অমলীন হয়ে থাকবে।

 বাঙালী জাতির ইতিহাসে আশীর্বাদের দিন ছিলো ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী। যেদিন শেখ মুজিবুর রহমান  ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ করেন

''১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি পল্টনে তাঁকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেয়ার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয় জনগণের কত কাছাকাছি তিনি চলে এসেছেন। এটা ছিলো একটি রাজনৈতিক পালাবদলের নমুনা। কারণ এই বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়ার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠলেন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৬৮ সালের ছাত্রসংসদের নির্বাচনী প্রচার উপলক্ষ্যে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নভেম্বর মাসে চার পাতার একটা প্রচারপত্র প্রকাশ করে। এর নাম ছিল ‘প্রতিধ্বনি’, সম্পাদক আমিনুর রহমান। শেষের পাতায় দুটো লেখা ছিল, দুই কলামে। প্রথম কলামে ছিল ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি। শিরোনাম ছিল ‘কর্মমুখর অতীতের স্বাক্ষর’। এতে বিগত ছাত্রসংসদের কর্মকাণ্ডের একটা ফিরিস্তি ছিল। দ্বিতীয় কলামে ছিল ছয় দফা কর্মসূচির বর্ণনা।

ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগ প্রকাশিত বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’র শেষ পৃষ্ঠায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের প্রথম ব্যবহার হয়। এর শিরোনাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত পূর্ব বাংলার ‘মুক্তি সনদ’ ছয় দফা। ‘বঙ্গবন্ধু’ দুই শব্দের আলাদা করে ছাপা হয়েছিল। শেখ মুজিবের জন্য এই উপাধির আবিষ্কর্তা ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা এবং ওই সময়ে ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক মুশতাক। তাঁর চিন্তা ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো একটা জুতসই কিছু শেখ মুজিবের জন্য খুঁজে বের করা। এই ভাবনা থেকেই বঙ্গবন্ধু শব্দের উৎপত্তি। বিষয়টি একসময় সিরাজুল আলম খানের কানে যায়। তিনি এটা ‘অনুমোদন’ করেন।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ আনে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন রাজনৈতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং গুটিকয় সাধারণ সৈনিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এই মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। ৩৫ জন আসামির সবাইকে পাকিস্তানি সরকার গ্রেফতার করে।

মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা টের পেয়ে বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং স্বৈরাচারী আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে। ছাত্র-জনতার মিছিলে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। গণআন্দোলনে নতিস্বীকার করে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্ত সব আসামিকে মুক্তি প্রদানের ঘোষণা দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয় এবং ওই সভায় তৎকালীন ডাকসুর সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলার জনগণের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান নাম ছাপিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

রাজনীতিতে শেখ মুজিবের একচেটিয়া ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার পথে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এটা পরবর্তী সময়ে তাঁর নামের অপরিহার্য অংশ হয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ  তিনি জাতির জনক উপাধি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জাতির জনক' উপধি দেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব /সংগঠক এবং তৎকালীন ডাকসু ভিপি জনাব আ.স.ম. আব্দুর রব। 

শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ নির্দেশনা দিয়েছিল।

"...মনে রাখবা- রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।" ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেস কোর্স ময়দানের এক জনসভায় এই বজ্রঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।

  শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার এবং মা সায়েরা খাতুন।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তাঁর সাত বছর বয়সে।

খুবই অল্প বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন সম্পর্কে আত্মীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে।

নয় বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে এবং পরে ম্যাট্রিক পাশ করেন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে।

গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৯ সালে স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কাশ্মিরী বংশোদ্ভুত বাঙালি মুসলিম নেতা মি.সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীকালে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রাভাবিত করেছিলেন।

উনিশশ' ৪২ সালে এট্রান্স পাশ করার পর শেখ মুজিব ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে যেটির বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। এই কলেজ থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন।

তবে স্কুল জীবন থেকেই তিনি তাঁর নেতৃত্ব দেবার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। 

তিনি ১৯৪৩ সালে যোগ দেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে এবং ১৯৪৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সম্মেলনে যোগদানের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন।



Monday, January 24, 2022

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১

 বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা


বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখার জন্য এবার মোট ১১ টি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার পাচ্ছেন মোট ১৫ জন সাহিত্যিক। 

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার কমিটি ২০২১-এর সদস্যদের সম্মতিতে এবং বাংলা একাডেমি নির্বাহী পরিষদের অনুমোদনে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সচিব এইচ এম লোকমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকদের নাম ঘোষণা করা হয়। 






 এবার যারা বাংলাএকাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন:

★কথাসাহিত্যে ঝর্ণা রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, 

★প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দীন হোসেন, 

★কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, 

★অনুবাদে আমিনুর রহমান ও রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী,

★শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশিদ, 

★মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, 

★নাটকে সাধনা আহমেদ, 

★বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় হারুন-অর-রশিদ, 

★আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনিতে সুফিয়া খাতুন ও হায়দার আকবর খান রনো, 

★বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞান/পরিবেশবিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী 

★ফোকলোরে আমিনুর রহমান সুলতান। 



প্রাবন্ধিক হোসেন উদ্দীন হোসেন

কবি আসাদ মান্নান

কথা সাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান

কবি বিমল গুহ

৷ 
শিশু সাহিত্যিক রফিকুর রশিদ

কথা সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী 

ফোকলোর আমিনুর রহমান সুলতান

অধ্যাপক পান্না কায়সার

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী 

সাধনা আহমেদ



১৯৬০ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩ লাখ টাকা। এছাড়াও পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননা পত্র ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। 

বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার দেবেন। 

Saturday, January 8, 2022

কবি কথন/ ফারহানা হৃদয়িনী

 


কবি কথন

কবি যখন কবি তখন সে সাধারণ কেউ নয়,  কবি হওয়া সহজ নয়,  যে অন্য হৃদয়ের দুঃখ ব্যথা আপন অন্তরে ধারণ করতে পারে সেই তো কবি, যে হৃদয়ের বাগানে কথার ফুল ফোটায় সেই তো কবি। কবি হৃদয় কারো একার নয়,  কবি সার্বজনীন কবির ভাষায় ফুটে ওঠে মানবতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবি জ্বালায় দ্রোহের আগুণ। কবি যা লিখতে পারে সকলেই তা লিখতে পারেনা, কবি যে ব্যথা অনুধাবন করতে পারে সকলেই তা পারেনা। কবি যে প্রেমে উন্মত্ত হতে পারে সেটা সকলেই পারেনা। কবি জনতার মনের প্রতিচ্ছবি অংকন করে তার চেতনায় তার বিবেকে তার হৃদয়ের অণু পরমাণুতে। কবি গেঁথে চলে শব্দের স্বপ্নীল মালা। কবি ধণে নয় তার ভাষার গুণে ধণী হয়ে ওঠে, কবি ধনবান তার রচনায়। কবি মৃত্যুর পরেও বাস করে কারো কারো হৃদয়ে।  তাই কবিকে সাধারণ হলে মানায় না। কবি সব সময় অসাধারণ অভিব্যাক্তি নিয়ে পথ চলে তাই, সে হাজারের মাঝেও অসাধারণ রুপে ফুটে থাকে।

                                         ★ ফারহানা হৃদয়িনী ★

Sunday, December 12, 2021

মুক্তি যুদ্ধের রনাঙ্গনের অকুতোভয় নারী নেত্রী রওশন আরা বেগম নীলার সংগ্রামী জীবন ...!!

মুক্তি যুদ্ধের রনাঙ্গনের অকুতোভয় নারী নেত্রী রওশন আরা বেগম  নীলার সংগ্রামী জীবন.......

 ©®✒️✒️ফারহানা হৃদয়িনী







বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের প্রচুর অবদান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। 

"শত শত্রুর প্রতিরোধ রুখতে পারে নি তাদের,করতে পারে নি যাদের চেতনার ক্ষয়।নিঃশ্বাসে বারুদের গন্ধ, বুকে প্রত্যয়।ছিল না যাদের কোন প্রাণ হারাবার ভয়।

তাদের চেতনায় শুধু লাল সবুজের পতাকা উড়েছে, তারা রক্তদিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র গড়েছে। তারা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা,তারা আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা এনেছে।"


তেমনি একজন সংগ্রামী নারী কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রওশন আরা বেগম নীলা। যিনি এমন একজন নারী যে দেশপ্রেমকে রক্তে প্রবাহিত করে এগিয়ে চলেছেন ১৯৬৮ সাল থেকে স্বাধীকার, স্বাধীনতা,অসহযোগ আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। আজ পর্যন্ত নারী মুক্তি, নারী কল্যান নারী সংগ্রাম,যৌতুক,বাল্যবিবাহ,ইভটিজিং প্রতিরোধ, ও নারীদের সার্বিক জীবনধারার উন্নয়ণে সংগ্রামী নারী রওশন আরা বেগম নীলা রাজপথের চির জাগ্রুক সৈনিক। 

 কুৃমারখালীর মত মফস্বল শহরে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে নারীরা যে ভূমিকা রেখেছিল তা অনেক জেলার নারীরা রাখেন নি। সেই সব সংগ্রামী নারী আজ অনেকেই হয়তো রাজপথ হতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু রওশন আরা বেগম  নীলা একনিষ্ঠ ভাবে কাজ  করে চলেছেন। 



তাঁর বাবার চাকরি সূত্রে বগুড়া জেলার শান্তাহারে অবস্থান কালীন সময়ে ১৯৫৪ সালের ৬ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।  ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে রওশন আরা নীলার রাজনীতি জীবনের শুরু। তিনি তখন কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। সে সময় কুমারখালী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক রেজাউল করিম হান্নানের অনুপ্রেরণায় তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৬৮-৬৯ সালে প্রায় প্রতিটি মিটিং-মিছিলে যোগ দিতেন। তখন বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা ও ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে কুমারখালীতে আন্দোলন সংগ্রাম চলছিল। প্রতিটি মিছিলে তিনি সামনে থেকে স্লোগান দিতেন। ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’, আপোস না সংগ্রাম-সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো,জয় বাংলা’ প্রভৃতি স্লোগানে প্রতিদিন কুমারখালী শহর মুখরিত হতো।




১৯৭১ সালে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিকামী মানুষদের সঙ্গে পাকহানাদার আর রাজাকারদের রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ। সেই সময় তিনি মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে গ্রেনেড  হামলা ও মেশিনগান পরিচালনার ট্রেনিঙ গ্রহণ করেন। সেই সময় বোরকা পরে পথে পথে ঘুরে যুদ্ধকালীন সময়ের খবর সংগ্রহ করে, মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে চিরকূট ও চিঠি পাঠিয়ে রাজাকার ও পাক হানাদারদের অবস্থান সম্বন্ধে খবর পাঠাতেন। তাই যুদ্ধকালীন সময়ে রওশন আরা বেগম নীলা সব সময় রাজাকারদের হুমকি ধমকিতে থাকতেন। একদিন রাতে রাজাকাররা তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। এক রাজাকার রাইফেল তাক করে তার বুকে। সেই মুহুর্তে তার বাবা অনেক অনুনয় বিনয় করেন তাকে ছেড়ে দেবার জন্য। এর মধ্যে একজন রাজাকার তাঁর সহপাঠী হওয়ায় তাকে সেদিনের মতো মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন। 

 ১৩৭০ বঙ্গাব্দে (১৯৬৯) কুমারখালী জে এন হাই স্কুলে নির্মিত কুমারখালীর প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেরও অন্যতম রূপকারও তিনি।



সমাজিক উন্নয়নে  বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য মহীয়সী এ নারী সরকারীভাবে কুমারখালী উপজেলা ও কুষ্টিয়া জেলার শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে  বেগম রোকেয়া দিবসে "জয়িতা" পদকে ভূষিত হয়েছেন।




মহীয়সী এ নারী এখন নিরন্তর ছুটে চলেছেন সমাজের অসহায় পিছিয়ে পড়া, সুবিধা বঞ্চিত হতদরিদ্র নারীদের কল্যাণে। বাল্যবিয়ে বন্ধ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এ নারী দিন নেই রাত নেই আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন পাশাপাশি সামাজিক,সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধের ওপর যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের নানাভাবে সহযোগিতা, পরামর্শ দান করে যাচ্ছেন। 







Friday, December 10, 2021

কবি ও চিত্রশিল্পী শেখ রবিউল হক (শিল্পী থেকে শিল্পপতি; শিল্পপতি থেকে শিল্পী।) ✒️✒️রেফুল করিম

ছবিওয়ালা রবি (শেখ রবিউল হক)

শিল্পী থেকে শিল্পপতি; শিল্পপতি থেকে শিল্পী।

✒️✒️রেফুল করিম






সব জীবনই বোধহয় কোনো না কোনভাবে সৃজনশীলতার পরীক্ষা দিয়ে চলে। আর জীবন কে উজানের দিকে নিয়ে যাওয়া মানেই তো শিল্পিতভাবে বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকাটা কারো কারো কাছে শুধুই জাগতিক হিসেব নয়। অতিসংবেদি মন নিয়ে তারা বোঝে জীবন শুধু এই মাটি - পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয় - তা দূর নক্ষত্রের সঙ্গে বোঝা পড়া করে চলে।




 তখন চোখের কাছে দেখা সুন্দর একটা ভিন্ন মাত্রা পায়।বিষয়টি বোধহয় আরেকটু বিশ্লেষিত হওয়া দরকার। দুচোখ মেলে যা দেখা যায় তাকে চিত্রিত করা শিল্প নয়।অতিসংবেদিত শিল্পী মনে যে দূরের ইশারা আছে, তার কোনো সংকেত যুক্ত করতে হয় শিল্পে।দৃশ্য গ্রাহ্য একান্ত বাস্তবের মধ্যে একটা অধরা মায়া আছে। সেই মায়ার খোঁজে নিতে চান শিল্পী শেখ রবিউল হক। তিনি পেশায় শিল্পী নন; কিন্তু শিল্পী হয়ে বাঁচতে চান। নিজের অস্তিত্বে তিনি অনুভব করেন সেই অধরা সুন্দরের টান। তাকে মায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে শিল্পের কুহক৷ 





শেখ রবিউল হকের  শিল্পচর্চার সূচনা শৈশবে। দেশি পেন্সিল ও দেশি রং দিয়ে তখন কোন মঞ্চ সজ্জার কাজে দক্ষতা  প্রমাণ করেন৷  তারপর বিষয় চিত্রিত করার সুখ তাকে শিল্পের নতুন নতুন দিগন্ত স্পর্শ করার প্রণোদনা দেয়৷ তাই তিনি জলরঙের  ললিত  ভাবটা বুঝে ছবি আঁকেন এবং তেল রঙের গাঢ় স্বভাবটা উপলব্ধি করে চিত্র রচনায় মনেনিবেশ করেন৷ কখনো বাস্তববাদী রীতি মেনে একাডেমির ব্যাকরণ  অনুসরণ করে ছবি আঁকেন, কখনো বা ছবি ছবি তৈরি হয়েছে দ্বিমাত্রিক নকশাধর্মিতায় জোর দিয়ে৷ 




শেখ রবিউল হক শিল্পী থেকে শিল্পপতি, শিল্পপতি থেকে শিল্পী। তাঁর পেশা আবাসন শিল্প। বানিজ্যের লক্ষী বসত করে। লক্ষীর সঙ্গে স্বরস্বতীর যুগলবাসেই জীবন পূর্ণতা পায়- একথা পৌরাণিক কাল থেকে বহুবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বৈভবের  কাছে এলে অনেক সময়ই মানবতাবোধ ও শিল্পবোধ জীবন থেকে লুপ্ত হয়ে যায়।শেখ রবিউল হকের সুন্দরের সুষমায় স্নিগ্ধজীবন প্রত্যাশা করেন এবং সে পথেই নিবিড় নিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে ও বিদেশে তিনি প্রচুর শিল্পীর সঙ্গে মেলামেশা করে চিত্র রচনায়র গূঢ় অর্থ বুঝাতে চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ছবি পাঠ করে বুঝতে চেয়েছেন সৃজনশীলতার মর্ম। ছবি আঁকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা  এবং এ আকাঙ্ক্ষাকে ফলবতী করার জন্য নিজের মতো করে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এই শিল্পী। বানিজ্য সফল শেখ রবিউল হকের জীবন শিল্পের সুফলতা ও সফলতা অন্বেষণ করে চলেছে। 




নিসর্গের গীতময় প্রকাশ আর মানুষের অনাবিল ও স্নিগ্ধ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন এই স্বশিক্ষিত শিল্পী। অপেশাদার ও নিজস্ব  অনুশীলনে যারা শিল্পী হয়ে ওঠেন তারা বিচিত্র বিষয় আঁকেন। তাছাড়া তাদের ভাষাও হয় বিচিত্র রকমের। যেখানে পেশাদার ও একাডেমি শিক্ষিত  শিল্পী  কতগুলো রীতিমাফিক পর্ব অতিক্রম করে নিজের বিষয় ও শিল্প ভাষায় স্হির হন,  সেখানে স্বশিক্ষিত শিল্পী কখনোই একক কোনো ধারা অনুসরণ করতে চান না। একারণেই হয়তো শেখ রবিউল হকের ছবিতে একই সঙ্গে একাডেমিক রিয়ালিজম, ইস্প্রেশনইজম, অ্যাবাস্ট্র্যাকট ইত্যাদি শিল্প রীতি প্রকাশ দেখা যায়। 




সুন্দরের প্রতি পক্ষপাত মানুষের স্বভাবের অন্তর্লীন বৈশিষ্ট্য। যদিও সংজ্ঞা সুন্দরের ব্যাখ্যা করতে গেলে সুন্দর কে আর সীমিত শর্তে সীমায়িত রাখা যাবেনা। তার অনেক সংজ্ঞা তৈরি হবে এবং ইতিমধ্যে অনেক সংজ্ঞাই তাত্বিকেরা নিরূপণ করেছে। তবুও তো প্রকৃতিতে সুন্দরের ধ্রুবক রয়ে গেছে। ফুল সুন্দর, শিশুমুখ সুন্দর অথবা ব্যাপ্ত করে যদি তবে বলতে হয় নিসর্গ, মানুষ ও প্রাণিকূল ইশ্বরের হিসেবে বা প্রকৃতির নিয়মের সুন্দরের প্রতিনিধি। এরকম ভাবন থেকে শেখ রবিউল হক ফুল এঁকেছেন, মানুষ, নিসর্গ দৃশ্য,নারী এবং ভাইবোনের সম্পর্কে গভীরে যে প্রীতি ও স্নেহ আছে, তা ও চিত্রায়িত করেছেন৷ 



শিল্পের একটা বড় বৈশিষ্ট্য উপরিতল দেখে বিষয়টির গভীরতাকে আবিস্কার করা।চোখের দেখা নয়, মনের অনুভবকে দৃশ্যায়িত করার মধ্য দিয়ে চিত্রকলা মাধ্যম প্রকাশের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। ' অক্সিজেন কারখানা ', ' তিনি একজন ',' নিটোল বন্ধুত্ব' এসব নামের ছবিতে শেখ রবিউল হক বিষয় ছাপিয়ে রং ও গড়নকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করিয়েছেন। এ ধরনের ছবিতে ফিগার থাকলেও তা রঙিন নিসর্গের চেয়ে বড় অবয়বে উপস্থাপিত হয়নি। রঙের বিমূর্ত এক চলাচল আছে। শেষে রং নিজের কথা বলবে। চিত্রকলা গভীরতর অর্থে রঙের সংলাপ বিনিময়, অনেক রঙের কাকলি,আলো- অন্ধকারের বুনট মাত্র। এই সত্য যে শেখ রবিউল হকের মর্ম ছুঁয়েছে, তা তার চিত্রকলার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। 






Wednesday, August 25, 2021

" বিতর্কিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন "

 



" বিতর্কিত নারীবাদী লেখিকা   
         তসলিমা নাসরিন "


           তসলিমা নাসরিন সমাজের নড়বড়ে কাঠামোতে হয়তো অপরিকল্পিত ভাবে ধাক্কাটা দিয়েছেন; ফলে ভঙ্গুর স্তুপের নিচে তিনি নিজেই যেনো চাপা পড়ে গেছেন! তারপরও জঞ্জাল সরানোর অবিরাম চেষ্টা! 


          ডাক্তার হিসেবে রোগীর পালস্ হার্টবিট যতটা বুঝতেন; উপমহাদেশের শঙ্কর বাঙালি সংস্কৃতির নাড়িনক্ষত্রের সমীকরণ ততটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কিনা; তা নিয়ে নিশ্চয়ই বিতর্ক রয়েছে। 


         নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক রচনার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। তার রচনা ও ভাষণের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, নাস্তিক্যবাদ এবং ধর্মবিরোধী মতবাদ প্রচার করায় তসলিমা বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন এবং ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে বাধ্য হন। 


         ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে আগস্ট ময়মনসিংহ শহরে তসলিমা নাসরিনের জন্ম হয়। তার মাতা ঈদুল ওয়ারা গৃহিণী এবং পিতা রজব আলী পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। তসলিমা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এমবিবিএস পাস করেন। তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।



          তেরো বছর বয়স থেকে তসলিমা কবিতা লেখা শুরু করেন।  ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থ আকারে তসলিমার কবিতা, উপন্যাস সহ বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়। 


          ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে তসলিমা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র প্রেমে পড়েন এবং গোপনে বিয়ে করেন। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানের সাথে তার বিয়ে এবং ১৯৯১ সালে বিচ্ছেদ হয়। তিনি ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক বিচিন্তার সম্পাদক মিনার মাহমুদকে বিয়ে করেন এবং ১৯৯২ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়। তসলিমার কোন সন্তানাদি নেই।


           তার কাব্যগ্রন্থ ও সংবাদপত্রের কলামে নারীদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের শোষণের কথা লেখায় ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে এই পত্রিকার অফিস ভাঙচুর করা হয়। এই সময় নির্বাচিত কলাম নামক তার বিখ্যাত প্রবন্ধসংকলন প্রকাশিত হয়, যার জন্য ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তসলিমা আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। 


          ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে "লজ্জা" নামক তার পঞ্চম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুসলিমদের দ্বারা একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা করা হয়। এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মুসলিম মৌলবাদীরা তসলিমার ওপর শারীরিকভাবে নিগ্রহ করে ও তার এই উপন্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি জানায়। গ্রন্থমেলা কর্তৃপক্ষ তাকে মেলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এই বছর অক্টোবর মাসে কাউন্সিল অব ইসলামিক সোলজার্স নামক এক মৌলবাদী সংগঠন তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে।


           তসলিমা নাসরিনের সাতটি আত্মজীবনী গ্রন্থের অধিকাংশ বাংলাদেশ ও ভারত সরকার দ্বারা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়। "আমার মেয়েবেলা" নামক তার প্রথম আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলেও ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে এই বইয়ের জন্য তসলিমা দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার জয় করেন। 


         ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তার দ্বিতীয় আত্মজীবনী "উতাল হাওয়া" বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে  তার তৃতীয় আত্মজীবনী বাংলাদেশ উচ্চ আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই বইটি দ্বিখণ্ডিত নামে প্রকাশিত হলেও ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের চাপে পশ্চিমবঙ্গেও বইটি নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়।  ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে "সেই সব অন্ধকার" নামক তার চতুর্থ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।


         ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির কথা বলেন। এর ফলে ইসলামি দলগুলো তার ফাঁসির দাবিতে সমাবেশ ও দেশ জুড়ে তার শাস্তির দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয় এবং জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সেসময় এক আলোকচিত্র শিল্পীর আশ্রয়ে তিনি লুকিয়ে ছিলেন। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাকে জামিন মঞ্জুর করা হয় এবং তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।


          বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সুইডেনে ও ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জার্মানিতে বসবাস করেন। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। এই সময় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দেশে ফেরার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হন এবং জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি ত্যাগ করে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফেরত পান ও বিনা অনুমতিতে বাংলাদেশ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে পুনরায় জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারী পরোয়ানা রুজু হলে তিনি পুনরায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন।



          দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে প্রবেশ করার ভিসা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন।  পরবর্তীতে তিনি "শোধ" নামক তার একটি উপন্যাসের মারাঠি ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে মুম্বই শহরে পৌঁছানোর সময় মুসলিম মৌলবাদীরা তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তসলিমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তসলিমার বাংলাদেশ প্রবেশে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। 


          ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলে তসলিমা কলকাতা শহরে বসবাস শুরু করেন। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম সৈয়দ নূরুর রহমান বরকতি নাসরিনের মুখে কালিলেপন করলে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করেন। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল বোর্ড নামক একটি সংগঠন তার মুন্ডচ্ছেদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঘোষণা করেন। 


         ২০০৭ খ্রী: ৯ই আগস্ট তিনি "শোধ" উপন্যাসের তেলুগু ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে হায়দ্রাবাদ শহরে গেলে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন নামক একটি রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় উত্তেজিত জনতা তাকে আক্রমণ করে। ১৭ই আগস্ট কলকাতা শহরের মুসলিম নেতারা তসলিমাকে হত্যা করার জন্য বিপুল অর্থ পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২১শে নভেম্বর অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি ফোরাম নামক একটি ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী কলকাতা শহরে তাণ্ডব শুরু করলে সেনাবাহিনীকে আইন ও শান্তিরক্ষার জন্য মোতায়েন করা হয়। এই দাঙ্গার পর নাসরিনকে কলকাতা থেকে জয়পুর হয়ে নতুন দিল্লি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।



          ভারত সরকার তাকে পরবর্তী সাত মাস একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখে। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে তাকে সিমোন দ্য বোভোয়ার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হলেও তিনি ভারতে প্রবেশে অনুমতি না পাওয়ার আশঙ্কায় ফ্রান্স যাত্রা করে পুরস্কার নিতে অসম্মত হন। এই সময় তিনি নেই কিছু নেই নামক তার আত্মজীবনীর ষষ্ঠ ভাগ প্রকাশ বাতিল করেন ও কলকাতার দাঙ্গার জন্য দায়ী দ্বিখণ্ডিত নামক তার বিতর্কিত বইটির কিছু অংশ অপসারণ করতে বাধ্য হন।


         ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত মৌলবাদীরা তার প্রাণনাশের হুমকি দিলে সেন্টার ফর ইনক্যুয়ারি তাকে ঐ বছর ২৭শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে সহায়তা করে এবং তার খাদ্য, বাসস্থান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”   


          তসলিমা নাসরিনের জীবনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র নির্বাসিত ২০১৪ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পায়। ২০১৫ সালে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে ৬২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে।


          তসলিমা তার উদার ও মুক্তচিন্তার মতবাদ প্রকাশ করায় দেশ-বিদেশ থেকে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।  আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার, নাট্যসভা পুরস্কার,  ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট কর্তৃক শাখারভ পুরস্কারসহ ফ্রান্স, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল পেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচ, নরওয়েভিত্তিক হিউম্যান-এটিস্ক ফরবান্ড কর্তৃক বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

 

          দেশে, বিদেশে এবং নির্বাসিত জীবনে বহু কবিতা, উপন্যাস, আত্মজীবনী ও কলাম লিখে তিনি যেমন নন্দিত  হয়েছেন; তেমন নিন্দিতও হয়েছেন। তারপরও তিনি অনেকের কাছে আধুনিক নারীজাগরণের পথিকৃত; মুখোশ আর খোলস ভাঙার চেষ্টায় অবিচল এক ব্যতিক্রমী কালজয়ী নারী।


©  হারুন-অর-রশীদ। 

(Source- "Bangladesh bans new Taslima book"- Ahmed, Kamal (13 August 1999)/BBC News(1 June 2009), Wikipedia)

Thursday, August 19, 2021

ফারহানা হোসেনের "অনুভূতি"

 


অনুভূতি 

ফারহানা হোসেন 

(“ ফারহা ডায়রী “ থেকে কিছু অংশ) 

————————————


অনুভূতিগুলো ভোতা হয়ে গেছে। খুব সকালে ডায়রী লিখি, ছোটবেলার অভ্যাস। আজ মনে হলো অবাক হবার পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে আমার।

যেমন বর্ষার মেঘলা আকাশে টলটলা বিশাল চাঁদ বা কালপুরুষ দেখলেও অবাক হইনা আর। অবাক হই না যখন দেখি কেউ অলিখিত পাপগুলো করে যাচ্ছে কিংবা কোন মহিলা এক স্বামী থাকা কালিন আবার বিয়ে করছে, আমি একটুও অবাক হই না। কারন আমার মনে হয় এমনই তো হবার কথা।

যখন শুনি এক সময় কিছু বাবা-মা ধর্ম নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেছে তাদের ছেলেমেয়ারা বিদেশী বিয়ে করেছে; আমি একটুও চমকাই না। কারন এমনই তো হবার কথা। শুধু করুণা হয় বাবা মা গুলোর জন্য। সত্যিতো খুব কস্টের।

যখন বুঝি খুব কাছের মানুষগুলো ষড়যন্ত্র করছে আমাকে নিয়ে আমি একটুও বিচলিত হই না। কারন বিচলিত হবার বা কস্ট পাবার কিছু নেই। মানুষতো আমরা, এটা করতেই পারে তারা। 

কোন ছোট বাচ্চা রেপ হলে বা কোন ছোট ছেলে এবিইউস হলে অবাক হই না এখন আর। কারন এমনই তো হবার কথা। আজকাল শুধু বাবা মা'দের একটু সাবধান হতে হবে। আর বাচ্চাগুলোর জন্য ভীষণ কষ্ট হয় আমার। কারন তারা বুঝে গেলো পৃথিবী কতো নোংরা জায়গা।


লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন। কেউ না কেউ পরিচিত। মানুষ নাই হয়ে যাচ্ছে; একটুও অবাক হই না। কারন এটাই ভাগ্য আল্লাহ লিখে রেখেছেন। ভাগ্যের উপর খবরদারী করার সাধ্য কার আমাদের! তবুও কষ্ট হয় মানুষগুলোর জন্য। আর দেখবো না কোনদিন। কিন্তু অবাক হবার পালা শেষ। কারন এতো মৃত্যু প্রতিদিন অনুভূতি শুন্য করে দিয়েছে। শুধু কষ্টগুলো গুমরে উঠে দু চারদিন খেতে পারিনা। একেই মনে হয় ডিপ্রেশন বলে। কষ্ট পাই তারপরও অবাক হইনা এই তো জীবন। 

কেউ কিছু সারপ্রাইজ বা গিফট দিলে শুধু বলি ওয়াও, একটুও অনুভূতি কাজ করে না। মনে হয় এটাই তো হবার কথা। আমি জানতাম আমাকে সারপ্রাইজ দিবে। 

এই যে দিনে দিনে অবাক হবার পালা আর অনুভূতি গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে-- আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি আর নিজে নিজে বলি নিজেকে, 'হে সৃস্টিকর্তা এমন কিছু ম্যাজিক করে দাও আমার জন্য যা দেখে আমি বিস্মিত জ্ঞানশুন্য হই'।

আমি সৃষ্টিকর্তাকে বলি, 'যা আমার তা আমার জন্যই রাখো। আমি আবার অনুভূতি ফিরে পেতে চাই এই পৃথিবীর বুকে...'

যদি কোন অপরিচিত মানুষ অধিকার নিয়ে বলে-- তুমি বাইরে যেও না অবস্হা 

খারাপ।

আমি অবাক হবো আবারও কারন কেউ তো স্বার্থ ছাড়া ফিলিংস দেখায় না আজকাল। আমি  সৃস্টিকর্তাকে বলি আমার জন্য এমন কিছু আশ্চর্য করো যাতে আমার মনে ছোট একটা পাখির গান শুনলেও অনুভূতি জাগ্রত হয়। একটা ঘাস ফড়িং উড়তে দেখলেও আমি যেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।

অচেনা কেউ মারা গেলেও চিৎকার করে কাঁদি। কেউ ষড়যন্ত্র করলে যেন ভিষন কষ্ট পাই।

আমি চাই আবার আমার অনুভূতিগুলো ফিরে আসুক। আমি চেয়ে চেয়ে অবাক হবো। পৃথিবীর সব কষ্ট, সৌন্দর্যগুলো মনে গেঁথে।

Friday, August 13, 2021

একজন পরী মনি এবং নারীর লাঞ্চনা..

 


একজন পরী মনি এবং নারীর লাঞ্চনা..

-----✒️📝জসিম মল্লিক

পরী মনির কোনো চলচ্চিত্র আমি দেখিনি কিন্তু তার নাম অনেক শুনেছি। সে বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় একজন নায়িকা। পরী মনি খুবই রুপসী নায়িকা। সে ভাল অভিনেত্রীও বটে না হলে সে শুধু রুপ দিয়ে জনপ্রিয় হতে পারত না। পরী মনি একজন চলচ্চিত্র কর্মীই নন তিনি কারো কন্যা, কারো বোন, কারো বন্ধু কারো বা প্রেয়সী। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সে বাংলাদেশের নাগরিক এবং একজন গর্বিত নারী। নিশ্চয়ই তার জাতীয় পরিচয় পত্র আছে, পাসপোর্ট আছে। সে বাংলাদেশের ভোটার। সে পাসপোর্ট নিয়ে দেশ বিদেশে যায়। একজন নাগরিকের যা যা করার অধিকার আছে পরী মনিরও আছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর যে অধিকারের কথা বলা আছে সবই পরী মনির জন্য প্রযোজ্য। সে অন্য আর দশটা নারীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে শোবিজের মানুষ। মানুষকে বিনোদন দেয় সে। এঞ্জলিনা জুলি, কাজল বা রেখার মতোই তার গুরুত্ব। সরকারকে সে ইনকাম ট্যাক্স দেয়, সরকার তার অভিনীত চলচ্চিত্র থেকে আয়কর নেয়। চলচিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার রুটি রুজির ব্যবস্থা হয় যখন একটা চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হয়।

আচ্ছা পরী মনিকে এতো হেনস্থা হতে হচ্ছে কেনো! সে তথাকথিত বোট ক্লাবে ধর্ষণ চেষ্টার বিরুদ্ধে মামলা করেছে বলেই কি! পরী মনি নিশ্চিতভাবে সাপের লেজে পা দিয়েছে। যারা পরী মনিকে রাতের অন্ধকারে হেনস্থা করেছে তারা টাকা ওয়ালা মানুষ। বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে টাকাই সব। আইনের শাসন, মানবতা, ন্যায়বিচার মাথা কুড়ে মরে। টাকা দিয়ে বাংলাদেশে সবই করা সম্ভব। সত্যকে মিথ্যা, দিনকে রাত করা যায়। নারীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশে যথেষ্ট শক্ত আইন থাকা স্বত্বেও নারীরা প্রতিনিয়ত হেনস্থা হচ্ছে! ধষর্ন, হত্যা, নির্যাতন, লাঞ্চনা, অবিচার থেমে নেই। ঘরে বাইরে, রাস্তায়, হাটে বাজারে, বাসে, লঞ্চে, অফিসে সর্বত্র। বাংলাদেশ পুরুষশাসিত দেশ। পুরুষের ক্ষমতার কাছে নারী তুচ্ছ। পুরুষেরা হায়েনার ভূমিকায়। সেখানে নারীরা মোটেই নিরাপদ না। নারী খেকো পুরুষেরা কখনও ভাবে না যে এই নারীই তার কন্যা, জায়া, জননী। মনে হয় তারা ঘরেও এসব করতে দ্বিধা করে না।

৩ 

পরী মনির অপরাধ কী? যে সব গল্প ফাঁদা হচ্ছে তা চর্বিত চর্বন। গল্পের স্ক্রিপ্ট সবই এক। খুবই দুর্বল স্ক্রিপ্ট। দেশের যে হাজার হজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে, পাচার হয়ে যাচ্ছে, বড় বড় অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে সেসব নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নাই। কারণ এসব করছে প্রভাবশালীরা। তাদের পশমও ছুঁতে পারছে না কেউ। অথচ পুরো দেশ এক অসহায় নারীকে নিয়ে পড়ে আছে। যেনো পরী মনিকে অপমান করতে পারলে, চরিত্রহীন বানাতে পারলে, রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করতে পারলে, শাস্তি দিতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। 

যে দেশে নারীর সম্মান নেই, যে দেশে নারীরা নিরাপদ নয়, যে দেশে নারীদের ভোগের সামগ্রী মনে করা হয় সে দেশ কখনও মর্যাদাশীল জাতি হতে পারবে না। নারীকে ভালবাসুন, তাদের সম্মান করুন। নারী সমাজেরও উচিত তাদের মর্যাদার প্রতি, অধিকারের প্রতি সচেতন হওয়া, সোচ্চার হওয়া। পরী মনির ঘটনাই শেষ ঘটনা না। অসংখ্য পরী মনি প্রতিদিন ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে, দেশে বিদেশে নির্যাতিত হচ্ছে, লাঞ্চিত হচ্ছে। নারীর লঞ্চনা বন্ধ করতে হবে। পরী মনিদের বাঁচতে দিন।

টরন্টো ১৪ আগষ্ট ২০২১



Sunday, August 8, 2021

#আজ_(বঙ্গমাতা)_রেণুর_একানব্বইতম_জন্মদিন_# ------✒️📝 ওয়াহিদ ফেরদৌস

 





#আজ_(বঙ্গমাতা)_রেণুর_একানব্বইতম_জন্মদিন_#

-----------------✒️📝 ওয়াহিদ ফেরদৌস

একটি বহুল প্রচলিত বাক্য, 'সব শ্রেষ্ঠ পুরুষের পেছনে থাকে এক নিভৃতচারী নারীর ভূমিকা'। 'বঙ্গমাতা' শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব' সম্পর্কে লিখতে গেলে মনে হয় এই বাক্যটি এই মহীয়সী নারীর ক্ষেত্রে যথাযোগ্য প্রবচন হওয়া আবশ্যক।


বাস্তবিক বঙ্গবন্ধুর সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার নেপথ্যে, একদিকে যেমন তাঁর পিতার দৃঢ় সমর্থন ও অর্থনৈতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি গৃহকোণে বালিকাবধূ  থেকে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, সন্তানদের মা, ও পুত্রবধু হিসেবে 'রেণু' জাতিরপিতার লক্ষ অর্জনে আপোষহীন অবস্থান এবং বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী হওয়ার কারণে ব্যক্তিগত সুখ,ভোগ-স্বাচ্ছন্দ বিস্বর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে পারিবারিক জীবনের দ্বায়িত্ব-কর্তব্যের চাপ থেকে মুক্তি দিয়ে, জাতিকে পরম লক্ষ স্বাধীনতার পথে নেতৃত্ব প্রদানে, সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে, সম্ভাব্য সব রকমের সহায়তা দিয়েছেন।





অন্যদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর পিতাকেও সে যুগের নয় বরং এ যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ও একজন অতি আধুনিক এবং অসাধারণ দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পাই-তাঁর অসাধারণ উক্তির মধ্যে! "রাজনীতি কর আপত্তি করবো না--- তবে পড়া-লেখা না শিখলে মানুষ হতে পারবেনা"।


একসময় চারপাশের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ যখন তাঁকে বলতেন 'আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে তাতে তার জেল খাটতে হবে'। তখন 'শেখ লুৎফর রহমানের' অসামান্য উক্তি ছিল, 'সে দেশের জন্য কাজ করছে,  অন্যায় তো করছে না'!



এই পিতার সংসারে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বাবা-মা হারা তিনবছর বয়সের 'রেণু' তেরো বছর বয়সের 'খোকার' বিবাহিত স্ত্রী হয়ে! ভবিষ্যতে যিনি বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা-স্থপতি বঙালি জাতির পিতা হবেন,এবং তাঁরই সু-যোগ্য সহধর্মিণী হয়ে উঠবেন! সেই ঘটনাটিও বাঙালি জাতির জন্য সমান তাৎপর্যপূর্ণ। 




" বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যানকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী' অর্ধেক তার নর" 

কবি নজরুলের কবিতাংশের এই অমর বাণীটি 'রেণু' নামের এই নারীর জন্যই রচিত হয়েছিল হয়তো! বিশ্বের মহান সৃষ্টিতে যেসব নারীর নাম উল্লিখিত হয় তাঁরা স্বগুণে আপন মহিমায় ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। যেমন-প্রীতিলতা,বেগম রোকেয়া প্রমুখ, এরপর যে নামটি সগৌরবে উল্লেখ করতে হয় তিনি হলেন 'রেণু'। 



যাদের কথা নজরুল বলেছেন- '"জগতের যতবড় জয়, বড় অভিযান, মাতা-ভগ্নি ও বধুধের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান"

সেই নারী, সেই মাতা,সেই ভগ্নি,সেই বঁধু'দের অন্যতম হলেন 'মুজিব' পত্নী 'শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব' আমাদের অতল শ্রদ্ধার, অসীম গর্বের, 'বঙ্গমাতা' পরম মমতাময়ী 'মা'। 


সকল মহৎ ও সফল ব্যক্তির সাফল্যে 'প্রেরণা দিয়েছে,শক্তি যুগিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী' এইসব প্রেরণা ও শক্তির পেছনের নারীর কথা কখনো প্রকাশ পেয়েছে,কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই অপ্রকাশ্য রয়েগেছে। তেমনি একজন আমার 'মা' রেণু!



এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে আমরা দেখেছি অভিজাত ও শিক্ষিত ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব দিয়েছন,বিশেষ করে নবাব ও জমিদার পরিবার। সেইসাথে মাড়োয়ারী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সন্তানেরা ছিল। কারণ এদের অর্থবিত্ত ছিল প্রভাব ও প্রতিপত্তিও ছিল।


ইতিহাসে খুব কম রাজনৈতিক নেতার পরিচয় পাওয়া যায়, যিনি পরিবার ও সমাজের টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন, যাদের প্রধান ভিত্তি,শক্তি ও উৎস ছিল জনগন! সেই বিরল দৃষ্টান্তটি স্থাপন করেছেন আমাদের টুঙ্গিপাড়ার 'খোকা'।


যে খোকা একাধারে বিপুলভবে জনসমর্থন অর্জন করেছেন। নিজের ও জনগনের শক্তি,সাহস বৃদ্ধি পায় সেই কাজটিই তিনি করতেন, জনগনের সাথে বেঈমানী করেন নি, জনকল্যান,সমাজসংস্কারের কথা ভবতেন, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে কুন্ঠাবোধ করেন নি! তাই তিনি হয়ে ওঠেন স্বভাবজাত কিংবদন্তি,ওয়ে ওঠেন বিপ্লব ও স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা।


আব্রাহাম লিংকনের জীবন সংগ্রামের কথা আমরা জানি, শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের জনপ্রিয়তার কথা আমরা শুনেছি, হোসেন সহীদ সোহরাওয়ার্দীর দেশপ্রেমের কথা আমরা শুনেছি, মাহাত্মাগান্ধীর আত্মত্যাগের কথা আমরা শুনেছি! কিন্তু বাংলাদেশের স্থপতি,স্বাধীনতার রূপকার,জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর প্রাণপ্রিয়তমা 'রেণু'র কথা আমরা কতটা জানি!? আমাদের প্রজন্মরা কতটুকু জানে!?


বঙ্গবন্ধু নামের এই 'খোকা' মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তিনি সাধারণ মানুষর জীবনঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের ভলোবেসেছেন, ভালোবাসা পেয়েছেনও। তাই তাদের অধিকার নিয়ে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন! স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন! বীরের জাতি হিসেবে বিশ্ব-দরবারে "বাংলাদেশ" নাম প্রতিষ্ঠা করেছেন! বাঙালি জাতিকে শিক্ষিত ও উন্নত জীবনের অধিকারী করতে চেয়েছেন, তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার প্রধান আধার ছিল মানুষ,মানুষ এবং মানুষ।


এই মানুষের জন্যই তাঁর আদর্শ,দেশপ্রেম এবং সাহস। ধর্মবর্ণ, শ্রেনীগোষ্ঠী নির্বিশেষ সব মানুষর প্রতি তাঁর অঙ্গিকার,দায়বদ্ধতা ও আত্মত্যাগ ইতিহাসের গবেষণায় বিশ্লেষিত হওয়া উচিৎ । এই সবকিছুর নেপথ্যে যে নিভৃতচারীনি মানুষটি নিরলস ভূমিকা পালন করেছেন তিনিই হলেন আমাদের 'মা' বঙ্গমাতা 'শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।


বঙ্গবন্ধুর জীবনসঙ্গী 'রেণু'র সম্পর্কে একটি কথা বলবো, আমার মনে হয়েছে তিনি একজন ঈশ্বর প্রদত্ত নারী ছিলেন! কবির ভষায় বলতে পারি- "রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন রাজারে শাসিছে রাণী, রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।"



বঙ্গবন্ধুর জীবনে তিনি ছিলেন একটি 'বাতিঘর' এবং মাইলস্টোন, যেমন-১। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ। ২। বঙ্গবন্ধুর বিএ পরীক্ষার সময় কলকাতায় গিয়ে অবস্থান। ৩। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অর্থের যোগান। ৪। ১৯৫৪সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর তিনি সন্তান সহ ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস। ৫। ১৯৬৭ সালে ছাত্র-জনতার দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্যারোলে মুক্ত হয়ে আইয়ুবের গোলটিবিল বৈঠকে যেতে নিষেধ করা। ৬। ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ভাষন দিতে যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন "তোমার অন্তর যা চাইছে আজ তা-ই বলবে"। ৭। ৩০ জুলাই ১৯৭৫ সালে দুইকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা কে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া। ৮। ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫'এ বঙ্গবন্ধুর  সাথে কুলাঙ্গার ঘাতকদের বুলেটে সাহাদাত বরণ করে মরণেও তাঁর সঙ্গী হওয়া!



সবশেষে- আমি বিস্মিত হই! বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁর ভূমিকা নিয়ে! যার কোন প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ ডিগ্রী ছিলনা,ছিলনা কোন রাজনৈতিক চর্চা, তথাপি এমন রাজনৈতিক দুরদর্শি, এতোটা মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান, এমন মানবিক, এতোই সহনশীল,ত্যাগী ও দেশপ্রেমীক, শতশত সাধারণ মানুষদের আবদার অভিযোগ, অনুযোগ সামলানো, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সময় দেওয়া,উকিলদের সাথে পরামর্শ, বঙ্গবন্ধুর শগতশত আত্মীয়স্বজন দের চাহিদা, তারপর সন্তানদের সবরকম দ্বায়িত্বপালন কি করে সম্ভব!? কোন্ অদৃশ্য বা দৈবশক্তি বলে তিনি তা পারতেন!? 



এমন বিরামহীন পরিশ্রমী,সঠিক দিক নির্দেশক,এমনই দেশপ্রেমী নারী'র এমন নজীর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই! স্যালুট বঙ্গমাতা। আমি এই মহীয়সী, গরবিনী মায়ের শুভ জন্মদিনে আমার সবটুকু ভালোবাসা ও অতল শ্রদ্ধা তাঁর চরণে ওজাড় করে দিলাম। হে মহান আল্লাহ, আপনি আমাদের এই শহীদ মা'কে জান্নাতুল ফিরদৌস নসীব করুন।

'বঙ্গমাতার অনুপ্রেরণা ও আত্মোৎসর্গ' লেখক মোঃ মোফাজ্জেল হক

 

বঙ্গমাতার অনুপ্রেরণা ও আত্মোৎসর্গ 

মোঃ মোফাজ্জেল হক।

[সভাপতি বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখা।সদস্য তথ্য ও গবেষণা উপকমিটি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।]

বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ আলোচনায় বঙ্গমাতার জীবনাচারও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উদ্ভাসিত। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতির পিতা থেকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠার পেছনে যার অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হচ্ছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।বঙ্গমাতার অনুপ্রেরণা ও আত্মোৎসর্গ অনস্বীকার্য। তার কারণেই একটি জাতির মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপন করে এর স্বাদও এনে দিতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে পেছন থেকে কাজ করেছেন শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু।

মহীয়সী নারীর এমন দৃঢ়প্রত্যয় সাহস জোগানোর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন ৭ই মার্চের অমর ভাষণ দিয়েছিলেন, বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন, ৭ই মার্চের ভাষণের নেপথ্য শক্তি—তিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। ডাকনাম রেণু। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা শেখ জহুরুল হক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের জ্ঞাতি সম্পর্কের চাচা এবং গ্রামের বর্ধিষ্ণু কৃষক পরিবার। 



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, ‘একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বারো-তেরো বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন যে আমার সাথে তার এক নাতনির বিবাহ দিতে হবে। কারণ তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবেন। রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা হোসনে আরা বেগম মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। রেণুর সাত বছর বয়সে দাদাও মারা যান। তারপর সে আমার মায়ের কাছে চলে আসে। রেণুদের ঘর আমার ঘর পাশাপাশি ছিল, মধ্যে মাত্র দুই হাত ব্যবধান।’ 


শেখ মুজিবের মা বেগম সায়রা খাতুন পাঁচ বছর বয়সে মাতৃহীন রেণুকে ঘরে তুলে নেন এবং নিজের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষা ও গৃহকর্মে বড় করে তোলেন। শৈশব থেকেই রেণু শেখ মুজিবসহ পরিবারের ছোট-বড় সব সদস্যের কাছে নিজেকে আপন হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে বড় সন্তান খোকা (শেখ মুজিবের ছোটবেলার ডাকনাম), যাঁর সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক, তাঁর চলাফেরা, কিশোর বয়স থেকেই নানা কর্মকাণ্ড, খানিকটা দুরন্তপনা, বেপরোয়া ও সাহসী মনোভঙ্গি কিশোরী ফজিলাতুন নেছা রেণুর জন্যও বড় হওয়ার প্রেরণা ও মুগ্ধতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের যেকোনো বিপর্যয়ে, অসুখ-বিসুখে উদ্ধারকর্মী হিসেবে শেখ মুজিবের সঙ্গে নিজেও তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ান। 

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম পাতা শুরু করেছিলেন সঙ্গী সহধর্মিণীর কথা দিয়ে। কেননা বেগম মুজিবের তাগিদেই এই প্রজন্মের বাঙালি আজ হাতে পেয়েছে স্বাধিকার আন্দোলনের এক অমূল্য দলিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের কাহিনি রচনার পেছনে স্ত্রীর যে উদ্যোগ ও উৎসাহ পেয়েছেন তাঁর বর্ণনায় লিখেছেন—  “আমার স্ত্রী আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেল গেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরো একদিন জেল গেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। ‘বসেই তো আছ, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি।’ বললাম, লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।” 


সেই ছোট্টবেলা থেকে এবং পরবর্তীকালে স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের এক আত্মত্যাগী সহযোগী হয়ে ওঠেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সংগ্রাম, আন্দোলন ও কারাজীবনেও তিনি এক অনুকরণীয় ত্যাগী নারী হিসেবে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। স্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবনকালে কখনো স্বামীকে একনাগাড়ে দুই বছর কাছে পাননি। কিন্তু কোনো দিন কোনো অনুযোগ-অভিযোগ ছিল না, কখনো বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও, চলে আসো বা সংসার করো বা সংসারের খরচ দাও। জীবনে কোনো প্রয়োজনে কোনো দিন বিরক্ত হননি। যত কষ্টই হোক কখনো ভেঙে পড়তে দেখা যায়নি তাঁকে।


একদিকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার সামলানো, আবার কারাগারে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তাঁর মনোবল দৃঢ় রাখা; অন্যদিকে আইনজীবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মামলার খোঁজখবর নেওয়া। নিজের সোনার অলংকার বিক্রি করেও মামলার খরচ জুগিয়েছেন। নিজেকে বঞ্চিত করে তিনি স্বামীর আদর্শ ও সংগঠনের জন্য নিজের সম্বল প্রায় সবই বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের কল্যাণের জন্য করছেন। টাকার অভাব, সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য দরকার, কেউ অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তু কখনোই এসব কথা কাউকে বলতেন না। নীরবে কষ্ট করে সমস্যার সমাধান করেছেন।


এমনও দিন গেছে মামলা চালাতে গিয়ে তাঁর কাগজপত্র, উকিল জোগাড় করতে অনেক খরচ হয়ে গেছে। এদিকে বাজারও করতে পারেননি। কোনো দিন বলেননি যে টাকা নাই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন। আচার দিয়ে ছেলে-মেয়েদের বলেছেন যে প্রতিদিন ভাত-মাছ খেতে ভালো লাগে নাকি। আসো, আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাই, এটা খেতে খুব মজা। একজন মানুষ, তাঁর চরিত্র কতটা সুদৃঢ় থাকলে যেকোনো অবস্থা মোকাবেলা করার মতো ক্ষমতা ধারণ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে পদে পদে তিনি আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। প্রকাশ্যে প্রচারে কখনোই আসেননি।


১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তান সরকার ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করে। ৭ জুন ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে ধর্মঘট সফলভাবে পালনে বেগম মুজিবের ভূমিকা ছিল অন্যতম। গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি লুকিয়ে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তাঁদের ছোট ফুফুর ফ্ল্যাট বাসায় চলে যেতেন। ওখানে গিয়ে নিজের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলে, বোরকা পরে একটা স্কুটার ভাড়া করে ঢাকায় পড়ুয়া ছোট ভাইকে নিয়ে ছাত্রনেতা আর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। আন্দোলন চালাবে কিভাবে তার পরামর্শ, নির্দেশনা তিনি নিজেই দিতেন। আবার ওই বাসায় ফিরে এসে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নিজের বাসায় ফিরতেন। বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে এই ধর্মঘট যাতে পালিত হয় এবং চলমান আন্দোলনের সফলতার জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যেতেন। সবই করতেন গোপনে এবং রাজনৈতিক মেধায়। 


একটা সময় এলো ছয় দফা, না আট দফা? পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা চলে এলেন ঢাকায়। তদানীন্তন শাহবাগ হোটেলে থাকতেন নেতারা। বেগম মুজিব মাঝে মাঝে বড় মেয়ে হাসুকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা) পাঠাতেন তাঁদের স্ত্রীদের একটু খোঁজখবর নিয়ে আসার জন্য, আর সেই সঙ্গে কে কে আছে একটু দেখে এসে তাঁকে জানাতে। ছোট ভাই রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে রুমে রুমে গিয়ে সব দেখেশুনে মাকে এসে রিপোর্ট দিতেন শেখ হাসিনা। বেগম মুজিবের একটা ভালো নেটওয়ার্ক ছিল সারা দেশে। কোথায় কী হচ্ছে তার সব খবর চলে আসত তাঁর কাছে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক নেতাই বেগম মুজিবের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন।


আওয়ামী লীগের মধ্যে সে সময় খুব গোলমাল। একদল পিডিএমএ যোগদান করার পক্ষে, আর একদল ছয় দফা। ১৯ মে ১৯৬৬ সালে ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতে ওয়ার্কিং কমিটির বর্ধিত সভা। ডেকোরেটর, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সে যুগে ছিল না, নিজ হাতে রান্না করে তিন দিন সবাইকে খাইয়েছেন বেগম মুজিব। সঙ্গে বিভক্ত নেতাদের নানা পরামর্শ দিয়েছেন, সাবধান করেছেন যেন ছয় দফা থেকে আট দফার দিকে চলে না যায়। বেগম মুজিবের মানসিক দৃঢ়তা সেই সময়ের রাজনৈতিক জাতীয় সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কার্যকর ছিল।


নেতাদের নানামুখী পরামর্শে তিনি শুধু বলতেন, ‘লেখাপড়া জানি না কী বুঝব, খালি এটুকু বুঝি যে ছয় দফা আমাদের মুক্তির সনদ, এর বাইরে আমি কিছু জানি না।’ জেলখানা থেকে শেখ মুজিব দৃঢ় উচ্চারণে জানিয়ে দিয়েছেন, আর যাই হোক ছয় দফা থাকতেই হবে। ছয় দফা থেকে একচুল এদিক-ওদিক হওয়া যাবে না। বিশেষ কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত হলো ছয় দফা ছাড়া আর কিছু হবে না।


বেগম মুজিবের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। একবার যা শুনতেন তা আর ভুলতেন না। স্লোগান থেকে শুরু করে অনেক রাজনৈতিক পরামর্শ, নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত আসত বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে।


১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকাকালে প্রতিদিন কী বিপুল আগ্রহে স্ত্রীর আগমনের প্রতীক্ষায় থাকতেন তা তাঁর লেখনীতে দেখতে পাই। ঘরে-বাইরে বেগম মুজিবই ছিলেন তাঁর পরামর্শক, উপদেষ্টা, সহচর আর নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। সে সময়ের লেখা কারাগারের রোজনামচা থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।


১৫ জুন ১৯৬৬  দুঃখ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘মাত্র ২০ মিনিট সময় যাবতীয় আলাপ করতে হবে। কথা আরম্ভ করতেই ২০ মিনিট কেটে যায়। নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছা হয়, কিন্তু উপায় কী? আমরা তো পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষ হই নাই। তারা তো চুমুটাকে দোষণীয় মনে করে না। স্ত্রীর সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে, কিন্তু বলার উপায় নাই।’


২৬ জুন ১৯৬৬  রেণু স্যারিডন খেতে দিতে চাইত না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। বলতাম, আমার হার্ট নাই, অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। বাইরে তার কথা শুনি নাই কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।


৬ জুলাই ১৯৬৬ বিকালে চা খাবার সময় সিকিউরিটি জমাদার সাহেবকে আসতে দেখে ভাবলাম বোধ হয় বেগম সাহেবা এসেছেন। গত তারিখে আসতে পারেন নাই অসুস্থতার জন্য। ‘চলিয়ে, বেগম সাহেবা আয়া।’ আমি কি আর দেরি করি? তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবি পরেই হাঁটা দিলাম গেটের দিকে। রেণুকে জিজ্ঞাসা করলাম,  ‘খুব জ্বরে ভুগেছ। এখন কেমন আছ?’  ‘পায়ে এখনো ব্যথা। তবে জ্বর এখন ভালোই।’   বললাম, ‘ঠাণ্ডা লাগাইও না’।  আজ অনেক সময় কথা বললাম। সময় হয়ে গেছে, ‘যেতে দিতে হবে।’ বিদায় দিয়ে আমার স্থানে আমি ফিরে এলাম।  কখনো কখনো স্ত্রীর উপস্থিতি কামনায় আকুল হয়ে উঠতেন, অপেক্ষা করে থাকতেন, না এলে মুষড়ে পড়তেন কিছুক্ষণের জন্য—


২১ জুলাই ১৯৬৬ ভেবেছিলাম আজ রেণু ও ছেলে-মেয়েরা দেখতে আসবে আমাকে। হিসাবে পাওয়া যায় আর রেণুও গত তারিখে দেখা করার সময় বলেছিল, ‘২০ বা ২১ তারিখে আবার আসব।’ চারটা থেকে চেয়েছিলাম রাস্তার দিকে। মনে হতে ছিল এই বোধ হয় আসে খবর। যখন ৫টা বেজে গেল তখন ভাবলাম, না অনুমতি পায় নাই।  শেখ মুজিবের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেগম ফজিলাতুন নেছা ছিলেন অফুরান প্রেরণার উৎস। ১৯৬৬-তে ছয় দফা ঘোষণার পর থেকে শেখ মুজিব যখন বারবার জেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তখন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বেগম মুজিবের কাছে ছুটে আসতেন। তিনি তাঁদের বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন নির্দেশনা পৌঁছে দিতেন এবং লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতেন। জেলখানায় দেখা করার সময় ছেলে-মেয়েদের শিখিয়ে নিতেন একটু হৈচৈ করার জন্য, আর ওই ফাঁকে বাইরের সমস্ত রিপোর্ট স্বামীর কাছে দেওয়া আর তাঁর কাছ থেকে পরবর্তী করণীয় নির্দেশনা জেনে নেওয়া। নির্দেশনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।



আমাদের বঙ্গমাতা ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান এবং ধৈর্যশীল মানবিক মানুষ। জাতির পিতার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' এবং 'কারাগারের রোজনামচা' লেখার মূল প্রেরণা ও উৎসাহ ছিল তাঁর জীবনসঙ্গী ফজিলাতুন্নেছার। শেখ মুজিবের ১২ বছর কারাবাস-কালে ছেলেমেয়েদের পিতৃস্নেহ দিয়েছেন বেগম মুজিব। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে প্রধান অবলম্বন ছিলেন তাঁর স্ত্রী। স্ত্রীকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সর্বগুণে গুণান্বিতা ফজিলাতুন্নেছার সাহায্য ও সহযোগিতা না পেলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব হত না। বেগম মুজিব তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাটিয়েছেন। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে বৈঠকে যোগদান করতে অনুমতি দিয়েছিল, তখন বেগম মুজিব তাঁর স্বামীকে এভাবে বৈঠকে যোগদান না করার পরামর্শ দেন। এবং বলেন- 'যদি বৈঠকে যোগ দিতেই হয়, তবে মুক্ত মানুষ হিসেবে বৈঠকে যোগ দেবেন।' কতটুকু আত্মবিশ্বাস ও বিচক্ষণতা থাকলে এ ধরনের পরামর্শ দেয়া যায় তা অনুভবের বিষয়। শেখ মুজিব ফজিলাতুন্নেছার কথা রেখেছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গমাতা বুঝতে পেরেছিলেন এই গণআন্দোলনকে রুখে দেয়ার সাধ্য আয়ুব সরকারের নেই। মাওলানা ভাসানী, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সহ অনেকে তখন রাজপথ গরম করে রেখেছিলেন। এদের আন্দোলনে দ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো চারিদিকে। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকল বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আয়ুব সরকার। বঙ্গবন্ধুর এই নিঃশর্ত মুক্তির পেছনের কারিগর আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান এবং এই মামলায় অভিযুক্তদের গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। এবং এই জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।



বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব ছিলো না, যদি না বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার মত মানবিক নারীর সহযোগিতা না থাকতো। যতবার বঙ্গবন্ধু জেলে গেছেন, ততবারই তাঁর যোগ্য স্ত্রী কাপড়চোপড় গুছিয়ে দিতেন আর লেখালেখি করার জন্য সাথে দিতেন খাতা-কলম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থের শুরুতে ী ফজিলাতুন্নেছা প্রেরণা না দিলে আমরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতেই পারতাম না।১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি নির্মাণের জন্য বঙ্গমাতা গৃহনির্মাণ সংস্থা থেকে ৩২ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। আমরা বেগম মুজিবকে এক দূরদর্শী নারীরূপে দেখি তাঁর সংসার যাত্রায়।১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল হয়ে উঠল সারাদেশ। ভুট্টোর প্রবল বিরোধিতার মুখে ঢাকায় নির্ধারিত ৩ মার্চের গণ পরিষদ অধিবেশনে ১ মার্চ ঘোষণার মাধ্যমে স্থগিত করে দেয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বাংলার আপামর জনতা। ২ মার্চ হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার ঘোষণা দিলেন তিনি। ৭ মার্চ ভাষণে যাওয়ার আগেও বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতার পরামর্শ শুনেছিলেন। ঘর থেকে বের হবার আগে তাঁর স্বামিকে ডেকে নিয়েছিলেন, তাঁর সাথে কারা যাচ্ছেন তা জেনে প্রথমে বলেছিলেন জনসভায় যাওয়ার পথ পরিবর্তন করতে। পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্য কারো পরামর্শ না নিয়ে নিজের বুদ্ধি আর বিবেক যা বলে তা বলার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ লিখিত ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুকে ফজিলাতুন্নেছা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, 'তোমার পিছনে ইয়াহিয়ার বন্দুক এবং সামনে মুক্তিকামী মানুষের অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা।' ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আত্ম জাগৃতির দীর্ঘ পথ বেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্য রচিত হলো। তাতে সর্বত্রই শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কাহিনী বর্ণিত আছে। সেই মহাকাব্যে ক্ষুদ্র পরিসরে আছেন আমাদের বঙ্গমাতা। বঙ্গমাতার বিশালতা ও ব্যাপ্তি প্রতি পাতায় পাতায় হওয়া উচিত ছিল।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ও যুদ্ধকালীন তিনি তাঁর ডানার আড়ালে রেখেছেন সন্তানদের। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে সন্তানদেরকে বলেছেন- ' কতবার কত দুর্দশায় পড়েছি, এবার না হয় একটু বেশি কষ্ট হবে।' চারিদিকে যুদ্ধ, যত্রতত্র হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, এরমাঝে সমস্ত দেশের দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধুর উপর। সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেনাপতিকে পেছন থেকে সাহস যুগিয়েছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা একে অপরের সাথে এত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে, কাউকে আলাদা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। ফজিলাতুন্নেছা তিন বছর বয়স থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে মৃত্যু পর্যন্ত একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের সৌরভে বিমোহিত ছিলেন। রেনুকে শেখ মুজিবের অলংকার মনে করা হলেও শুধুমাত্র শেখ মুজিবই জানতেন তাঁর জীবনীশক্তি আর প্রাণরস তিনি রেনুর থেকেই প্রতিনিয়ত পেয়ে রাজনীতির স্বর্ণশিখরে উঠেছিলেন।

পরিশেষে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে, বঙ্গমাতার অবদান তত বেশি উদ্ভাসিত হবে। বঙ্গমাতার বিশালত্বের অজানা নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হবে। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বঙ্গমাতার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

তথ্যসূত্রঃ "আওয়ামী লীগের আত্মত্যাগী নেতাদের সংগ্রামী জীবন "  মোঃ মোফাজ্জেল হক।