Showing posts with label Story. Show all posts
Showing posts with label Story. Show all posts

Saturday, August 14, 2021

সাহিল রহমানের লেখা গল্প "সেটেল ম্যারিজ

 


সেটেল ম্যারিজ

----------✒️📝সাহিল রহমান

একটা লম্বা ঘোমটা দিয়ে বিছানায় বসে আছে তুলি, লাল একটা শাড়ি পড়েছে সে, শাড়িটা এমন ভাবে পড়েছে যে তুলির চেহারা দেখতে পাবার কোন উপায় নেই, দেখার মধ্যে শুধু তার ফর্সা হাত দুটি দেখা যাচ্ছে, ভর্তি কাচের চুড়ি সম্বলিত দুটো হাত। তুলি সুন্দর করে এক হাত অন্যটির উপর রেখে চুপ করে অপেক্ষা করছে।


তুলির জামাই ঘরে ঢুকতেই একটা ধাক্কা খেল, “হায় খোদা এটা কে?” 

কিছুক্ষণ আগেই রিসিপশনের অনুষ্ঠান শেষে তুলিকে নিয়ে ওদের বাড়ি ফিরেছে আলভী, তখন তার পড়নে ছিল একটা পারপেল কালারের লেহেঙ্গা। তুলির বাবা-মায়ের সাথে আলভীর কথা বলতে বেশী জোর ত্রিশ মিনিট লেগেছে, তুলি তো তখনও ওই লেহেঙ্গাটাই পড়ে ছিল। তাহলে টকটকে লাল শাড়ি পড়ে বিছানায় কে বসে আছে? কেন জানি হুট করেই গলা শুকিয়ে গেল আলভীর। আলভী শুকনো গলায় ডাকল, “তুলি... তুলি...”


আলভীর কথার কোন উত্তর আসল না, মেয়েটি একদম মূর্তির মতন বসে আছে, কোন নড়াচড়া নেই।

“ব্যাপার কি?” কিছুই বুঝতে পারছে না আলভী। আলভী এক দুই পা করে বিছানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর একবার বসার চিন্তা করেও বসল না, সামান্য ঝুঁকে ঘোমটার ভেতর দিয়ে চেহারা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না সে। এমন সময় আলভী আবিষ্কার করল ঘোমটা সরিয়ে মেয়েটার মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে তার, শুধু ইচ্ছে না প্রচণ্ড ইচ্ছে করছে। দুই তিন বার নিজের হাত ঘোমটার দিকে বাড়াল আলভী, আবার সরিয়ে নিল মনের অজান্তেই, শেষ পর্যন্ত হাজার সংশয় নিয়ে আলভী ঘোমটায় হাত দিতেই খপ করে আলভীর হাত ধরে ফেলল তুলি, সঙ্গে সঙ্গে বিরাট ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসল আলভী। 

সেই সাথে বেশ কয়েকজন মানুষের “হো হো” চিৎকারে কানে তব্দা বেধে গেল সবার, কিছুক্ষণ পরেই আলভী লক্ষ্য করল তুলি ঘোমটা সরিয়ে আলভীর হাত ধরে আছে আর হাসছে, তুলির বান্ধবী সহ বাড়ির আরও কয়েকজন হেসে কুটিকুটি হচ্ছে, যারা এতটা সময় ধরে লুকিয়ে ছিল আশেপাশে। 

এই বিষয়টিতে সবাই খুব আনন্দ পেলেও তেমন একটা আনন্দ পেল না আলভী, বরং নিজেকে কেমন বোকা মনে হল তার, যদিও আলভী সবার সাথে তাল মিলিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসতে থাকল। 


~


“আপনি কি ভয় পেয়েছেন?” এবার শাড়ী গহনা খুলে একদম সাধারণ পোশাকে আলভীর সামনে বসেছে তুলি, মুখে এখনো হাসি ভাব শেষ হয়নি তার, তখনের সেই আনন্দের রেশ এখনো তুলির মধ্যে বিরাজমান। 

আলভী মাথা নেড়ে বলল, “হুম একটু ভয় পেয়েছি”

আলভীর কথাটা শুনে তুলির আনন্দ যেন  আরও দিগুণ হয়ে গেল, তুলি হাসতে হাসতে বলল, “কি যে তাড়াহুড়ো করে লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে শাড়ী পড়েছি কি বলব!” 

তুলির কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে তার বেশ আগে থেকেই এই পরিকল্পনা ছিল, আর এটা করতে পেরে সে মহা খুশী।

যদিও তুলির এই আনন্দের সাথে খুব একটা তাল মেলাতে পারল না আলভী, আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকাল সে, রাত দুটা বাজতে চলেছে, চোখ ভেঙ্গে ঘুম আসছে তার।


মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তুলির সাথে বিয়ে হয়েছে আলভীর, মেয়ে দেখার পর পছন্দ হওয়া, এই শেষ। এরপর থেকে শুধুই বিয়ের আয়োজন। বিয়ের সব আয়োজন নিয়ে তুলিও ভীষণ ব্যাস্ত ছিল, এরমধ্যে আলভীর সাথে তিন দিন শপিংএ গেছে তুলি, ওই সময় দুজন টুকটাক কথা বলেছে, এছাড়া আর তেমন কথা হয়নি দুজনের মাঝে। আলভী যে তুলির সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি তা নয়, বেশ কয়েকবারই কথা বলার জন্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোন বারই ঠিক মতন কথা হয় নি। তুলির সাথে আলভীর যতবার কথা হয়েছে ততবারই তুলি বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করেছে। বিয়ের আয়জন আর বিয়ের প্রোগ্রাম নিয়ে তুলির সেই রকম সয়লব অবস্থা, প্রায় দশ বারোটা প্রোগ্রাম, প্রতিটা প্রোগ্রামের এত এত লোকজন, ফটোগ্রাফার, স্টেজ, ম্যাচিং ড্রেস আরও কত কি? এসব আলোচনা নিয়ে বেশী কথা বলতে ইচ্ছে করে না আলভীর, তাই কথাও আগায় নি তেমন।


~


আলভীর চোখ কয়েকবার লেগে আসল, ঝিমুনি গ্রাস করে ফেলেছে ওকে, মাথার নিচে দেবার জন্য বিছানা থেকে বালিশ টেনে নিল আলভী, এমন সময় তুলির কথায় চোখ মেলল সে, 

“ওমা আপনি কি ঘুমাতে যাচ্ছেন নাকি? মাত্র তো রাত দুটা বাজে, এখনো কত কাজ বাকী!” তুলির এই কথায় এবার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল আলভীর, এখনো আরও প্রোগ্রাম বাকী আছে নাকি? 


“আজ আমাদের গল্প করার রাত, বিয়ের সব কিছু ম্যানেজ করতে গিয়ে আপনার সাথে গল্পই করতে পারিনি, আজকে থেকে গল্প শুরু, প্রথমে আপনি বলবেন তারপর আমি, ওকে।” তুলির কথাটা শুনে এবার চোখ মেল তাকাল আলভী, লক্ষ্য করল মেয়েটার মধ্যে একটা এমন একটা মনোভাব আছে যে সে যেটা চাইবে সেটাই হবে, অনেকটা ছোট বাচ্চাদের মতন। তুলির দিকে এবার আরও লক্ষ্য করে তাকাল আলভী, প্রথম দেখা দেখির সময়ের পর এই দ্বিতীয় বার ভাল করে তুলিকে ঠিক মতন দেখল সে।


“এবার বলেন আমাকে কেন পছন্দ করলেন?” তুলির সেই একই ধরণের ভাবান্তরহীন প্রশ্ন,

“আপনাকে ভাল লেগে গেছে তাই” প্রশ্নের উত্তরটা এক কথায় দিল আলভী, যদিও এই প্রশ্নটা আলভীর তুলিকে করা উচিৎ ছিল। সার্টিফিকেটের বয়সে তুলি আলভীর থেকে ১৩ বছরের ছোট, সার্টিফিকেট অনুযায়ী তুলির বয়স ২৫, আর আলভীর ৩৮, সেই দিক থেকে তুলির আলভীকে ভাল লাগাটাই অধিক বেমানান।


“আচ্ছা, এবার বলেন কয়টা প্রেম করেছেন?” কথাটা বলার সময় চোখ দুটো সরু করে ফেলল তুলি, ভাবটা এমন খুব সিরিয়াস কিছু শুনতে যাচ্ছে সে,

“একটাও না” নিরস উত্তর করল আলভী,

“কি বলেন, ভাল লাগার মতন কেউ ছিল না, এটা কি করে সম্ভব!” খুব জোর গলায় কথাটা বলল তুলি, তুলির কথায় মুচকি হাসল আলভী, কিন্তু মনের মধ্যে একটা চিনচিন কষ্ট অনুভব করল সে, যেই কষ্টটা দুনিয়ার কাছে বেমানান হলেও আলভীর কাছে নিখাদ একটি যন্ত্রণা। 


~


দশ বছর আগের স্মৃতি কিন্তু আলভী এখনো সেটা পরিষ্কার মনে করতে পারে। 

নীল শাড়ী পরিহিত একটি মেয়ে ঠিক আলভীর সরাসরি সামনে বসে ছিল, মেয়েটি ঠায় তাকিয়ে ছিল মাটির দিকে, আলভী বারবার আর চোখে তাকাচ্ছিল তার দিকে। হঠাৎ আলভীর মামী বললেন, ওরা দুজন একটু আলাদা কথা বলুক, আমরা অন্য ঘরে যাই? 

কথাটা বলতেই হুড়মুড় করে সবাই উঠে গেল অন্য ঘরে, রয়ে গেল শুধু আলভী আর নীল শাড়ি পরিহিত মেয়েটি। সেদিন সেই সময় কেমন যেন অন্য রকম একটি অনুভূতি হয়েছিল আলভীর, যেটা আলভী ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। অনেকটা সময় নিশ্ছুপ থাকার পর হালকা করে গলা খাকাল আলভী, আলভীর গলার শব্দে একনজর চোখ তুলে তার দিকে তাকাল মেয়েটি, তারপর মুহূর্তেই আবার মাটির দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল সে। কিন্তু মেয়েটির সেই দৃষ্টি যেন আলভীর হৃদয়ের মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়ে গিয়েছিল তার।


সিভিতে মেয়েটির নাম লেখা ছিল, কিন্তু সেটা কোন ভাবেই মনে করতে পারল না আলভী, এই কিছুক্ষণ আগেও তো মনে ছিল, কিন্তু এখন বেমালুম ভুলে গেছে সে। কি বলবে আলভী, কিছুই যেন মাথায় আসছে না তার। 


“আপনি কি একদমই কম কথা বলেন?” অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর এমন একটা উদ্ভট প্রশ্ন করে বসেছিল আলভী, যদিও এই উদ্ভট প্রশ্নে কাজ হয়েছিল, এখান থেকেই শুরু হয়েছিল আলভী আর স্মৃতির কথার সূত্রপাত ! 


সেদিন দুজনের মধ্যে সামান্য কিছু কথা, কয়েকবার চোখে চোখ পড়া, অল্প সময়ের আলাপ আলভীর মন জুড়ে ছিল, আলভীর মনই তাকে বলে দিচ্ছিল এই মেয়েটিকে আলভীর ভাল লেগেছে, ভাল লাগা এমনই একটি বিষয় যেটা বুঝতে সময় লাগে না, নিজের মনই বলে দেয় সেটা।


~


প্রেম করার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি আলভীর, তাই বেশ ঝড় পোহাতে হয়েছে তাকে ও তার পরিবারকে, স্মৃতিকে প্রথম দেখায় আলভীর পছন্দ হওয়াতে বেশ খুশী ছিল আলভীর পরিবার, তাই খুব বেশী দেড়িও করতে চায়নি তারাও। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথা বার্তা বেশ তোরেজোড়ে শুরু হয়েছিল সেই সময়। 


ওইদিকে আলভীর সাথে স্মৃতির সম্পর্কটাও আগাচ্ছিল সুন্দর, সকাল ৮ টায় অফিসের জন্য বের হতে হলেও রাত ২ টা পর্যন্ত স্মৃতির সাথে কথা বলত আলভী। ছুটির দিন সুযোগ পেলেই দুজন কফি খেতে চলে আসত। সেদিনের চুপ করে বসে থাকা মেয়েটি ঠিক চুপ করেই আলভীর হৃদয়ে অনেকটা জায়গা করে নিয়েছিল।


~


বিয়ের কথা আর দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কটা খুব ভাল মতন এগুচ্ছিল কিন্তু একদিন আলভী অফিস থেকে বাসায় ফিরতেই লক্ষ্য করল বাড়ির সবাই গম্ভীর হয়ে বসে আছে সামনের ঘরে, সবার মধ্যে একটি চিন্তিত ভাব। কাধ থেকে ব্যাগ রেখে আলভী খালি সোফায় বসতে বসতে বলল, “কি ব্যাপার? কোন সমস্যা নাকি?”


প্রশ্নের উত্তরে আলভী যেটা শুনল তা হল,

“তোমার হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে বিশ লক্ষ্য টাকা কাবিন করতে বলেছেন, এর কমে কোন ভাবেই কাবিন করবেন না তারা”

বিশ লক্ষ্য টাকা কাবিন! এটা তো অনেক, মাত্র দুই বছর হয় চাকরিতে ঢুকেছে আলভী, এত টাকা কাবিন করার সামর্থ্য তো আলভীর আসলেই নেই। কিন্তু আলভীর বাবার কথা শুনে যেটা বোঝা গেল, এই বিষয়ে মেয়ের পরিবার খুবই শক্ত, মেয়ের মান-সম্মানের বিষয় এটা, বিশ লাখের নিচে কাবিন করলে নাকি ওদের মান সম্মান থাকবে না!


স্মৃতির সাথে এই নিয়ে সেদিন রাতে কথা বলেছিল আলভী, কাবিনটা যে ছেলের সামর্থ্যের উপর হওয়া উচিৎ এই কথাটা বোঝাতে সেদিন অক্ষম হয়েছিল আলভী, এই বিষয়ে পরিবারের সিধান্তই শেষ সিধান্ত সেটা বলেছিল স্মৃতি, কাবিনের টাকা তো আর দেয়া লাগছে না, তো বিশ লাখ টাকা কাবিন করলে কি সমস্যা। 


বিষয়টা নিয়ে আলভী আর তার পরিবার আর ঘাটায় নি, রাজি হয়ে ছিল এই সিধান্তে, কিন্তু এই সম্মতিতে শেষ রক্ষা হয়নি। বিয়ের কেনা-কাটা, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, মেয়ের কস্মেটিক্স, শাড়ী সকল বিষয় নিয়ে হিমশিম খাবার অবস্থা হয়ে পড়ল আলভীর, আর তখনই লাগাম টানার সিধান্ত নিইয়েছিল আলভী ও তার পরিবার। ওদের অবশ্যই ছেলের সামর্থ্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। আলভীরা তো গুলশান বনানীর কোটি পতির মেয়ে ঠিক করেনি, নিজেদের মতনই মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়েকে পছন্দ করেছে, কিন্তু ওদের সব কিছুইতে তো উচ্চাখাঙ্খি কথা বার্তা!


সেই লাগাম টানার বিষয়টিও ভাল চোখে নিতে পারেন নি ওরা, হুট করেই সুন্দর সম্পর্কে একটি তিক্ততা চলে এসেছিল সেদিনের পর, আর এই তিক্ততার জেরে শেষ পর্যন্ত বিয়ে ভাঙ্গা। যদিও আলভী অনেক চেষ্টা করেছিল বিয়েটা টেকানোর যদিও সেটা হয়নি শেষ পর্যন্ত। আলভী স্মৃতির পরিবারের সাথে কথা বলেছিল কয়েকবার, কিন্তু ওদের তোপের মুখে আর কোন কথা বলার সুযোগ পায়নি আলভী।

“তোমার এখনই যদি এগুলো নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে তুমি আসলে অক্ষম” এমন একটি কথায় একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল আলভী। 


অন্য কেউ হলে হয়ত ওখানেই থেমে যেত, কিন্তু মন থেকে স্মৃতিকে ভুলতে পারছিল না আলভী, তাই একদিন স্মৃতির সাথে দেখা করতে গিয়েছিল, যদি দুজন মিলে কিছু একটা বন্দোবস্ত করতে পারে, যদি সম্পর্কটা ঠিক হয়, কিন্তু সেদিন স্মৃতির কথা শুনে আলভী মন থেকেই ভেঙ্গে পড়েছিল, 

“আমি সেটেল ম্যারিজ করছি একজন এস্টাবলিস্ট ছেলেকে বিয়ে করার জন্য!” স্মৃতির এই কথাটা শোনার পর আর একটিও কথা বলেনি আলভী, এই বিয়ে টেকানোর জন্য আর কোন চেষ্টাও করেনি সে। শুধু অনুধাবন করেছিল ৩০ হাজার টাকা বেতন আলসে বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত কোন বেতন না, এস্টাবলিস্ট হতে আজও অনেকটা সময় বাকী আছে তার! 


~


সেদিনের পর ১০ টা বছর কেটে গেছে আলভীর এস্টাবলিস্ট হতে হতে, ২৮ বছরের আলভীর বয়স আজ ৩৮ বছর। 

আজ সব কিছু সম্পন্ন করে তুলিকে বিয়ে করছে আলভী, কোন কিছুইতেই কোন কার্পণ্য করেনি, বরং প্রয়োজনের থেকে বেশী করা হয়েছে। সেদিন স্মৃতির চোখে যেই তাচ্ছিল্য ছিল আজ তুলির চোখে সেই তাচ্ছিল্য একদম নেই। 

আলভী তুলির চোখের দিকে তাকিয়ে তুলিকে পাল্টা প্রশ্ন করল “তুমি আমাকে পছন্দ করলে কেন?”


“আপনি এস্টাবলিস্ট আর …” কথার মাঝেই হেসে ফেলল আলভী, আলভীর হাসিতে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে গেল তুলি, যদিও সেই দিকে দেখার কোন প্রয়োজন বোধ করল না আলভী। মাথার নিচে বালিশটা দিয়ে বলল, 

“আমি অনেক টায়ার্ড, আমার অনেক ঘুম এসেছে, কাল সকালে কথা হবে” এটুকু বলেই চোখ বুজল আলভী, একটা সময় তুলির মতন বিয়ের দিন রাতে সারা রাত গল্প করে কাটানোর পরিকল্পনা আলভীরও ছিল, কিন্তু সেই উত্তেজনা সেই স্পৃহা এখন আর কাজ করে না, সেই বয়সটাও এখন নেই, সেই মায়া হারিয়ে গেছে অনেক আগেই, আলভীর মাথায় এখন কোটি কোটি টাকার হিসেবটাই বেশী শোভা পায়, এসব এখন আলভীর কাছে নিতান্তই বাচ্চামি!



গল্পঃ #হায়াত/পর্বঃ ৪/ সাহিল রহমান

হায়াত



পর্বঃ ৪ ও শেষ পর্ব


অগত্যা একটা ফোন পায় আসফাক, যেখানে তাকে বলা হয় স্ত্রী সুমির ভবিষ্যৎ মৃত্যুর কথা, কথাটা শুনে প্রথমে মাথা গরম হয়ে গেলেও ফোনকারী ব্যাক্তির অকাট্য কিছু প্রমাণে চুপ মেরে যায় আসফাক। সুমি সম্পর্কে অপ্রীতিকর এই ভবিষ্যৎ বানী শেষে, আসফাককে নির্দেশনা দেয়া হয় সময় ভ্রমণ সূত্রের, যেই সূত্র স্বয়ং আসফাক নিজেই তৈরি করেছে, আর এই সূত্র নিয়ে ছুটে এসেছে সুদূর ভবিষ্যৎ হতে। 


সেদিন সেই ফোনের পর আসফাকের জীবন পুরোপুরি অন্যরকম হয়ে যায়, ফোনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমেই আসফাক চলে যায় শহরের বাইরে পাইকপাল নামক একটি গ্রামে, যেখান হতে খুঁজে নেয় ভবিষ্যৎ হতে রেখে যাওয়া সময় ভ্রমণের সূত্র!


তার পরের নির্দেশনা অনুযায়ী আসফাক অপেক্ষা করতে থাকে একটি নির্দিষ্ট দিনের , ফোনের বর্ণিত বর্ণনা অনুযায়ী আসফাক একটি ট্যালি খাতা তৈরি করে, যেখানে প্রতিবার সময় ভ্রমণের পূর্বে টুকে রাখতে হবে সুমির অবস্থান, সময় ভ্রমণের সংখ্যা আর সুমির মৃত্যুর কারণ… 


কয়েক মাসের মধ্যেই চলে আসে সেই দিনটি, সেদিন ফোনের ভবিষ্যৎ বানী অনুযায়ী আসফাকের সামনেই মৃত্যু হয় সুমির। সেই সাথে আসফাক শুরু করে এমন এক যাত্রা যার শেষ কোথায় সেটা কেউই জানে না, এমনকি আসফাক নিজেও না…  


~


কেন যেন আজকাল আসফাকের কাজগুলো খুব সন্দেহ লাগে সুমির, সুমির আজকাল মনে হয় আসফাক ওকে ধোঁকা দিচ্ছে, আসফাকের কাছে সুমির প্রয়োজন শেষ, ওলট-পালট সব কল্পনা চোখের সামনে হুট করে প্রায়ই ভেসে ওঠে সুমির। 

আসফাক সুমিকে তার বাবার বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না ! আবার মাঝে মাঝে দেখা যায় সুমিকে মিথ্যা বলে আসফাক বাবার বাড়িতে ফেলে এসেছে! 


এমন হাজারো কল্পনা অহরহ চোখের সামনে ভাসলেও সুমি এটা বুঝতে পারে আসফাক সত্যি অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে, সে আগেও ব্যস্ত ছিল কিন্তু এখন তার কাজের ধরন, কাজের ব্যস্ততা, অস্থিরতা সব কিছুই কেমন অন্য রকম মনে হয়। আজকাল বড্ড একা লাগে সুমির নিজেকে, সব থেকে বড় ব্যাপার ভালবেসে বিয়ে করা আসফাক নামের মানুষটাকে ভয় হয় ভীষণ…


~


ট্যালি খাতার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে আসফাক, আসফাকের জন্য এখন অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ যেন একটি জায়গায় আটকে গেছে, তাই মাঝে মাঝে ট্যালি খাতায় চোখ বুলিয়ে নিজের সময়ের অবস্থান ঠিক করে নেয় সে। চোখ বোলাতে বোলাতে বিগত দিনের সময় ভ্রমণের নম্বরটা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল তার, যার শেষ কলামে লেখা- 


সময় ভ্রমণ নম্বর ৬৯৯, 

সুমির অবস্থান বান্দরবন, 

মৃত্যুর কারণ - পাহাড় ধ্বস, 


সংখ্যাটা দেখে এক চাপা কষ্টের নিঃশ্বাস ত্যাগ করল আসফাক, প্রায় দুই বছর হতে চলেছে, শেষবারের সময় ভ্রমণ সহ ৬৯৯-তম ভ্রমণ করা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, কিন্তু প্রতিবারেই কোন না কোন ভাবে মৃত্যু হয়েছে সুমির, কোথায় গেলে কি করলে অতীতের এই পরিণতি পরিবর্তন হবে কে জানে!


আসফাক তার ট্যালি খাতার নিচে নতুন করে নম্বর তুলল, 

সময় ভ্রমণ নম্বর ৭০০, তারপর টাইম মেশিনে উঠে বসে অতীতের এক সময় চলে গেল যেখানে সুমি গতকাল অব্দি জীবিত ছিল। 


~


সকাল বেলা উঠেই বের হয়ে পড়ল আসফাক, ইতিমধ্যে ভবিষ্যৎ হতে ফোন পেয়ে গেছে সে, বোঝা যাচ্ছে গত বারের অভিযান ব্যর্থ, ঢাকার বাইরে সুমিকে নিয়ে যাবার প্লানগুলো কাজে লাগেনি। 

আসফাকের আজকের প্লান ভিন্ন, সুমিকে এবার ঘরেই রেখে দেবে আসফাক, সন্ধ্যার আগে এসে বাইরে থেকে গ্যাসের লাইন, ইলেকট্রিক লাইন কেটে দেবে, ঘরের মধ্যে থেকে যেন সুমির কোন ধরনের বিপদ বা দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে এই সকল লাইনগুলি বিছিন্ন করে দেবে সে।  


পরিকল্পনা অনুযায়ী আসফাক সকাল সকাল বের হয়ে গেল, আসতে দেড়ি হবে এই কথাটাও বলে গেল সুমিকে।


~


বিকেল হতেই  অস্থির লাগতে লাগল আসফাকের, এই নিয়ে সুমিকে সে কত বার মরতে দেখছে তার ঠিক নেই, কিন্তু হাল ছাড়বে না আসফাক যত কিছুই হয়ে যাক না কেন। হাত ঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করল আসফাক। 


বাড়িতে পৌঁছেই বাইরে থেকে গ্যাস, ইলেকট্রিক সহ অন্যান্য সংযোগ বিছিন্ন করে দিল, তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিজ ফ্ল্যাটের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। আজ কি হবে সুমির সাথে সেটা দেখতে না চাইলেও বাধ্য হয়ে দেখতে হবে আসফাককে। চিন্তাটা মাথা হতে ঝেড়ে ফেলে দ্রুত সিঁড়ির দিয়ে পা চালাল আসফাক… 


বাড়ির দরজার সামনে এসে কলিং বেল চাপল আসফাক, কলিং বেল বাজল না, নিজেই মনে করে নিল বিদ্যুতের লাইন কাটা ! পকেট হতে চাবি বের করে গেট খুলল আসফাক, কেন জানি বুক ধুঁকধুঁক করে কাঁপছে তার। এই সময়টাতে সর্বদা বুকের মধ্যে ভয় কাজ করে আসফাকের। 


ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে প্রবেশ করল আসফাক, সুমি কি করছে কে জানে? ঘরের দরজার সামনে যেতেই সুমিকে দেখে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল আসফাকের। 

না ! সুমি এখনো জীবিত আছে, বিছানায় অন্য একটি ছেলের সাথে প্রেম খেলায় মশগুল হয়ে আছে সুমি, এতটাই মসগুল যে আশেপাশে কি হচ্ছে কোন কিছুরই খোঁজ নেই তার ! 


আসফাক তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলছে, যেই স্ত্রীকে বাঁচাতে দীর্ঘ দুই বছরের বেশী সময় নিজের জীবনটা তছনছ করে ফেলেছে আসফাক আজ সে কিনা এভাবে ধোঁকা দিচ্ছে তাকে? রান্না ঘরে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল আসফাক, তারপর ধুপ করে বসে পড়ল মাটিতে। 


~


আসফাকের অদ্ভুত চাল চলনে অস্থির হয়ে উঠেছিল সুমির জীবন, আসফাকের কাছ থেকে মুক্তি পেলে যেন সে বাঁচে, কিন্তু আসফাক সুমিকে এত সহজে ছেড়ে দেবে না সেটাও সুমি জানত। আর এই দোটানা থেকেই হুট করে একটি ছেলের সাথে অজান্তেই সুমি জরিয়ে পড়ে পরকীয়ায়। সুমি জানত সুমির এটা করা ঠিক না কিন্তু কেন যেন নিজেকে আটকাতে পারছিল না সে। আর অল্প সময়ের মধ্যে সুমির এই প্রেমের সম্পর্কটা অনেকটা গভীরে চলে যায়। সুমির ধারণা ছিল সুমির এই সম্পর্কের কথা আসফাক কোনদিনও জানতে পারবে না, আর আজ আসফাক দেড়ি করে আসবে সেটা বলেই গিয়েছিল, তাই প্রেমিককে নিজ বাড়িতেই ডেকে এনেছে সুমি। 


রান্না ঘর হতে হঠাৎ ধুপ একটি শব্দ শুনে হুশ আসল সুমির, সুমি বেড রুম হতে সামান্য গলা ছেড়ে বলল ‘কে?” সুমিকে জড়িয়ে রাখা প্রেমিক বলল বিড়াল-টিরাল হবে হয়ত। এক বার ভাবল সুমি, আসফাক এমনিতেই  অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে, আর আজ সে বলেই গেছে দেড়ি হবে, সুতরাং আসফাকের আসার কোন প্রশ্নই নাই। আর আসফাক এসে নিশ্চয়ই রান্না ঘরে ঢুকবে না, বেল বাজাবে প্রথমে… 


তবুও সুমির মনে খটকা রয়ে গেল, “একটু দেখে আসি” প্রেমিককে এই কথা বলে গায়ে চাদরটা জড়িয়ে বিছানা হতে উঠে সোজা রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াল সুমি, কাছাকাছি এসে আবার ডাক ছাড়ল “কে?” 


~


সুমির কণ্ঠ কানে আসল আসফাকের, বুঝতে পারল এদিকে এগিয়ে আসছে সুমি, উঠে দাঁড়াল আসফাক, রান্না ঘরের কেবিনেট হতে মাঝারি ধারাল ছুরিটা হাতে তুলে নিল সে, তারপর শক্ত হয়ে দাড়িয়ে রইল দরজার আড়ালে। সুমি রান্না ঘরে ঢুকেই ভেতরে তাকাল, একটু এগিয়ে নিচু হয়ে দেখল বিড়াল ঢুকেছে কিনা? নাহ কেউ নেই, হাফ ছাড়াল সুমি। তারপর বের হবার জন্য পেছনে ঘুরতেই হতভম্ব হয়ে গেল সে, শরীরের শক্তি মুহূর্তেই হারিয়ে গেল তার। সুমি দেখল ধারাল ছুরি হাতে আসফাক দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে !  


সুমি কিছু বলার আগেই তার পেটে ছুরি বসিয়ে দিল আসফাক, একটা চিৎকার করে উঠল সুমি, কিন্তু এই চিৎকারে কোন লাভ হল না বোধহয়, হাতের ছুরিটা আরও শক্তি করে সুমির পেটে ঠেলে দিল আসফাক। 


সুমির চিৎকারে হুড়মুড় করে সুমির ঘর হতে বের হয়ে এল তার প্রেমিক, সুমিকে আর আসফাককে দেখে কলিজা মুহূর্তেই উড়ে গেল তার, নিজের জান নিয়ে পালাল তৎক্ষণাৎ…


~


অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ আসল আসফাকের বাসায়, সুমির দেহটাকে তার গায়ের চাদর দিয়েই ঢেকে রাখল আসফাক, সমস্ত মেঝে জুড়ে রক্তের বন্যা, আসফাকের হাত জামা সুমির রক্তে লাল হয়ে গেছে। সুমির লাশের পাশ হতেই পুলিশ আসফাককে উদ্ধার করল, খুনের ছুরিটা তখনো সুমির শরীরে বিঁধে আছে। 


~


চারপাশে মানুষের ভিড়, পুলিশের সাইরেন আর এম্বুলেন্সের বাতি জ্বলছে আর নিভছে। সুমির লাশ এম্বুলেন্সে তোলা হল, তারপর আসফাককে উঠানো হল অন্য একটি গাড়িতে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের নিয়ে রওনা রওনা হল পুলিশ, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে গাড়ি অল্প দূরে গিয়ে দাড়িয়ে পড়ল জ্যামে! 


পাশের মসজিদ ওয়াজ চলছে, অনেক লোক জড়ো হয়েছে এখানে, তাই এত ভিড়। মসজিদের মাইকে বক্তার একটি কথা কানে আসল আসফাকের, আসফাকের মনে হল এই কণ্ঠের এই কথাগুলো আসফাক আগেও একবার শুনেছে… 


কথাগুলো আসফাক কোথায় শুনেছিল সেটা সে মনে করতে পারল না, হয়ত কোন এক সময় ভ্রমণে, মনে করার চেষ্টাটা বাদ দিল আসফাক, তারপর বিড়বিড় করে বলল, “আর না…”

নিজের তৈরি সময় ভ্রমণ যন্ত্রের কথা একবার মন হল তার, কিন্তু সেটা নিয়েও চিন্তা বাদ দিল আসফাক, পাইকপাল গ্রামে আসফাকের তৈরি এই যন্ত্র যেখানে লুকানো আছে সেটা কেউ কোনদিন খুঁজেও পাবে না। যদি গ্রামের লোকেদের কেউ কোনদিন খুঁজেও পায়, এটাকে একটা আস্তকুর ভেবে ফেলে দেবে ভাঙ্গারিতে।


~


অশ্রু সিক্ত নজরে বাইরে তাকাল আসফাক, মসজিদের বক্তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল সে, তারপর বিড়বিড় করে বক্তার সেই কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করতে লাগল বর্তমান সময়ের নামকরা বিজ্ঞানী আসফাক, যে কিনা তৈরি করেছিল সময় ভ্রমণের সূত্র…


অনেকটা পথ চলে আসার পর আসফাকের গাড়ির চালক আর সেখানে উপস্থিত পুলিশ লক্ষ্য করল, কিছুক্ষণ আগে খুনের স্পট হতে তুলে নিয়ে আসা মানুষটা পেছেন হতে বিড়বিড় করে করে বারবার একটি বাক্য বলে চলেছে, 


“মানুষের হায়াত নির্ধারিত, রিজিকে যা লেখা যা আছে তার বেশী একটা ভাতও সে খেতে পারবে না!” 


লোকটাকে পাগল মনে হল ওদের কাছে… 


“সমাপ্ত”


লেখকঃ Sahel Rahman



গল্পঃ #হায়াত/পর্বঃ ৩/ সাহিল রহমান

হায়াত



পর্বঃ ৩


সুমিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি ! 

বার্ন ইউনিটের ওটিতে ডাক্তার যখন সুমিকে নিয়ে যায় তার অনেক আগেই আসফাক এটা আন্দাজ করতে পেরেছিল যে সুমি বাঁচবে না। আর তাই এটা নিয়ে আসফাক না করল কোন চিন্তা আর না করল কোন আফসোস। আসফাকের সম্পূর্ণ চিন্তার গতি ঘুরে গেল ভিন্ন এক দিকে, আর তা হল, দুই বার সময় ভ্রমণ করেও কেন আসফাক সুমিকে বাঁচাতে পারল না? কি হতে পারে এর কারণ? হাসপাতালে সুমির ওটি থেকে অনেকটা দূরে একটা বেঞ্চের উপর বসে বেশ অনেকটা সময় ধরে এই বিষয়টা নিয়েই ভাবতে থাকল আসফাক…  


তারপর নিজে হতে একটি উত্তরে উপনীত হল সে, দুই বার সময় ভ্রমণ করে সুমিকে বাঁচাতে ব্যর্থ হবার একটাই কারণ হতে পারে, আর তা হল আসফাকের এই দুই বারের চেষ্টায় সুমির জন্য নির্ধারিত মৃত্যু পরিবর্তন হয়নি!  কোয়ান্টাম মেকানিক্সে সময়ের সাথে দুটি বিষয়ের সূক্ষ্ম সম্পর্ক রয়েছে, আর সেগুলো হল অবস্থান আর পরিণতি! 


কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে মানুষের পরিণতি নির্দিষ্ট হয়ে থাকে, সময় আর অবস্থানের সাথে এই পরিণতির পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু অতীতে এই সময়ে এসে আসফাক সুমির অবস্থান পরিবর্তন করছে ঠিকই কিন্তু পরিণতি এখানে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে! 


যার অর্থ আসফাককে সুমির জন্য এমন একটি অবস্থান খুঁজে বের করতে হবে যেখানে ওই নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সাথে সুমির পরিণতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আর এই জন্য আসফাককে বারবার ২৭ বছর করে সময় নষ্ট করলে চলবে না ! 

সুমির এই পরিণতির পরিবর্তিত করার জন্য তার সেই অবস্থান বের করতে হলে আসফাককে একের পর এক সময় ভ্রমণ করতে হবে, আর খুঁজতে হবে সেই অবস্থান যেখানে পরিবর্তন হয়ে যাবে এই অতীত!


হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কাছাকাছি বসে থাকা বেঞ্চ হতে ধীরে উঠে দাঁড়াল আসফাক, একনজর সুমির ওটির দিকে তাকাল সে।  লক্ষ্য করল সুমির বাবা, আত্মীয় স্বজনরা প্রায় সকলেই হাজির হয়েছে এখানে, সবার চোখে পানি আর মুখে কান্নার আওয়াজ। যেন কেউই মানতে পারছে না বিষয়টি। 


সুমির সব আপনজন কাঁদলেও তাদের মধ্য হতে শুধু আসফাক মোটেও কাঁদল না, ধীর পায়ে একটি শব্দ না করে বের হয়ে গেল হাসপাতাল হতে। সুমির সকল আত্মীয় সুমির এই দুর্ঘটনা মেনে নিতে না পারলেও দিন শেষে মেনে নিত, কারণ এটা মেনে নিতে হয়, কিন্তু আসফাক সত্যি সত্যি ঘটনাটাকে মেনে নিতে পারল না। 


কিছুদিন পর কাউকে কিছু না জানিয়ে সমাজ আর সকল আত্মীয় স্বজন হতে একদম হারিয়ে গেল আসফাক, সে কোথায় গেছে সেটা জানল না কেউই…


~


এই নিয়ে তৃতীয় বারের মতন পুনরায় ২৭ টি বছর পার করল আসফাক, এবার আসফাকের মস্তিষ্কে একত্রে বিছিন্ন কিছু ঘটনার প্রতিফলন অনুভব করল সে। সুমির গাড়ি দুর্ঘটনা, সিলিং ফ্যান মাথায় পড়ে যাওয়া আর রান্না ঘরে সিলিন্ডারে আগুন লেগে যাওয়া, এই তিনটি ঘটনাই যেন আসফাক একত্রে দেখতে পায়। 


দীর্ঘ ২৭ বছর পার করে নিজের সময় যন্ত্র তৈরি করার পর আসফাক এটাও উপলব্ধি করল যে একই সময় আসফাক যেন সুমিকে দুই ভাবে আগুনে পুড়ে যেতে দেখছে, এই অনুভূতিটা খুবই অদ্ভুত। আসফাকের মনে হয় আসফাক যখন সুমিকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিল ঠিক তখনই সেই একই সময়ে সে দূরে দাড়িয়ে এই ঘটনাটাকে পর্যবেক্ষণ করেছিল! 


কেন এমন অনুভূতি সেটা আসফাক ভাল করেই জানে, কারণ সেদিন আসফাককে যেই মানুষটা ফোন করেছিল সে ছিল আসফাক নিজেই, আর সে দূরে দাড়িয়ে দেখছিল সব কিছু। 


~


আসফাকের টাইম মেশিন তৈরি, কিন্তু এবার আসফাক আগের দুই বারের মতন এই যন্ত্রে উঠে বসল না, সে ঠাণ্ডা মাথায় অপেক্ষা করতে থাকল আর করতে চিন্তা করতে থাকল। আসফাক এবার অতীতের সেই একই দিনে ফিরে যাবে না, এবার সময় ভ্রমণ করার আগে খুব ভাল করে পরিকল্পনা করতে হবে আসফাককে। 


এবার আসফাক ফিরে অন্য একটি সময়ে, যেটা হবে সুমির মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগের!


~


সুমির মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে গিয়ে আসফাক আগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতীতের আসফাককে অবগত করবে, আসফাক জানে এবারও হয়ত সুমিকে বাঁচানো যাবে না, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এক এক করে। এই চেষ্টার মাধ্যমে বের করে আনতে হবে এমন একটি অবস্থান যেই অবস্থানে সুমির পরিণতি পরিবর্তন হবে, আর তখনই মৃত্যু থেকে বাঁচানো যাবে সুমিকে। 


সুমির মৃত্যুর সম্পর্কে অতীতের আসফাককে অবগত করার পরেই তার হাতে তুলে দিতে হবে সময় ভ্রমণের সূত্র, জানিয়ে দিতে হবে পাইকপালে আসফাকের এই ল্যাবের খোঁজ। এভাবে বারবার ২৭ বছর করে সময় নষ্ট করা সম্ভব নয়, সময় ভ্রমণের সূত্র ২৭ বছর আগেই দিয়ে আসতে হবে আসফাককে, যেন আসফাক সুমির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় অতীতে চলে যেতে পারে। 


~


সময় ভ্রমণ যন্ত্র তৈরির পরে প্রায় মাস খানেক ধরে সমস্ত পরিকল্পনা করল আসফাক, তারপর নিজের তৈরি এই পরিকল্পনা অনুযায়ী টাইম মেশিনের মধ্যে দিয়ে রওনা করল অতীতে… 


~


কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে একটা বড় কনফারেন্সে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে তরুণ সায়েন্টিস্ট আসফাককে, দেশের ভেতর ও বাইরের অনেক বিজ্ঞানী উপস্থিত আছেন এই সভায়। এছাড়াও উপস্থিত আছেন দেশের বিভিন্ন ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এক এক করে বিভিন্ন বিজ্ঞানী নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রোজেক্ট, বর্তমান গবেষণা ও বিভিন্ন ধরনের মতবাদ ও মতবেদ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য পেশ করল সকলের সামনে। বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ উৎসব আর উৎসুক পরিবেশ তৈরি হল সুবিশাল এই হল রুমটার মধ্যে। 


অন্যান্য সবার ব্যক্তিতা শেষে, আসফাককে স্টেজে আমন্ত্রণ করলেন এই কনফারেন্সের প্রধান অথিতি, হাসি মুখে স্টেজে উঠে এল আসফাক, তারপর নিজের বক্তব্য পেশ করল সকলের সামনে। আসফাকের ভীষণ  তথ্যবহুল আর কৌতূহলী বক্তিতায় সভায় উপস্থিত সকলের করতালিতে মুখরিত হল হল ঘর। আনন্দের সাথে চারপাশে এক নজর তাকাল আসফাক, মনের মধ্যে আনন্দের ঢেউ অনুভব করল সে। কিন্তু হঠাৎ আসফাক লক্ষ্য করল পেছনের দিকের সারিতে কেউ একজন হাত উঁচু করে বসে আছে, ছেলেটার ভাবভঙ্গি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোন প্রশ্ন আছে তার, কিছু জানতে চায় সে!


ছেলেটিকে দেখে মনে মনে খুশী হল আসফাক, এমন কৌতূহলী মানুষ পছন্দ তার, আসফাক অরগানাইজারদের মধ্যে একজনকে উদ্দেশ্যে করে ওই ছেলেটিকে মাইক দেবার জন্য ইশারা করল, একজন হেটে গিয়ে ছেলেটার হাতে মাইক দিলে, উঠে দাঁড়াল ছেলেটি! 


শুকনো, হ্যাংলা পাতলা গড়নের একটি ছেলে, সাদা টি-শার্ট পরিহিত, বোঝাই যাচ্ছে কোন ভার্সিটির শিক্ষার্থী। আসফাক চোখের ইশারায় ছেলেটিকে তার প্রশ্ন করতে বলল, ছেলেটি সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে অল্প সময় অপেক্ষা করেই প্রশ্নটা করে ফেলল, “স্যার সময় ভ্রমণ কি আসলেই সম্ভব? আপনি কি মনে করেন এই বিষয়ে?”


ছেলেটির প্রশ্ন শুনে একই সাথে অবাক আর বেশ বিরক্ত হল আসফাক, আজকের কনফারেন্সের বিষয়ের সঙ্গে সময় ভ্রমণ টপিক কোন ভাবেই জড়িত না, আর তার থেকেও বড় কথা সময় ভ্রমণ একটি বিজ্ঞানিক ফিকশন, আজকের মতন এমন একটি কনফারেন্সে এই ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা মোটেও সমীচীন নয়। নিজেকে শান্ত রেখে ছেলেটির প্রশ্নের উত্তর দিল আসফাক, 

“বিজ্ঞান সর্বদা যুক্তিতে চলে, সেখানে আমার মনে করা দিয়ে কিছু যায় আসে না, আজ পর্যন্ত জোগাড়কৃত সকল তথ্য আর উপাত্ত অনুযায়ী সময় ভ্রমণ এখনো একটি অবাস্তব বিষয়, এটি বিজ্ঞানিক ফিকশন ছাড়া আর কিছুই না !” 


কথাটা শেষ করে স্টেজ হতে নেমে গেল আসফাক, ওয়াশ রুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে, দুপুরে বেশ বড় লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে এখানে, তার আগে একটু হাত মুখ ধোঁয়া দরকার। ততক্ষণ পর্যন্ত আসফাক জানত না যে কিছুক্ষণের মধ্যেই সময় ভ্রমণের একটি অকাট্য প্রমান পেতে চলেছে সে…


ওয়াশ রুমের দরজার কাছাকাছি যেতেই মোবাইলটা বেজে উঠল আসফাকের, অপরিচিত একটি নম্বর, এক হাতে ফোনটা ধরে হ্যালো বলে অন্য হাত দিয়ে ওয়াশ রুমের দরজার হাতলে মোচড় দিল আসফাক, ফোনের ওপাশ হতে একটি কণ্ঠ ভেসে আসল আসফাকের কানে, যেই কণ্ঠটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চোখ কপালে উঠে গেল তার! 

“চলবে”




লেখকঃ Sahel Rahman



গল্পঃ #হায়াত/পর্বঃ ২/ সাহিল রহমান

#হায়াত



পর্বঃ ২

সুমি আসফাককে এমন অস্থির হতে কখনো দেখনি, সুমিকে এভাবে জোর করে আসফাক কেন বাবার বাড়িতে রেখে গেল সেটা কোন ভাবেই মাথায় আসছে না তার। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে আসফাক চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই সুমি বদিকে ফোন করেছিল, বদির মা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন ! 


তাহলে এমন কি হল যে আসফাক সুমিকে এভাবে মিথ্যা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল?  আসফাকের এই ব্যাবহারে ভেতরে ভেতরে এক অজানা সন্দেহ উঁকি দিতে লাগল সুমির মনে, আর এগুলো ভাবতে ভাবতে এক সময় সুমির চোখ লেগে আসল। ঠিক তারপর মুহূইর্তে সুমির মাথার উপর সজোরে সিলিং ফ্যানটা খুলে পড়ে, বিকট একটা শব্দ আর চিৎকার হবার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারায় সুমি। 


~


ওটির বাইরে পাগলের মতন এদিক সেদিন পায়চারি করছিল আসফাক, ঠিক ভোর হবার আগেই সুমির মৃত্যুর সংবাদ পায় সে। সুমির বাবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেও আসফাক একদম পাথর বনে যায়। আসফাকের কানে  তৎক্ষণাৎ একটি কথাই বাজতে থাকে, আর তা হল গত রাতে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ভেসে আসা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, 

“আমি আসফাক… ২৭ বছর ভবিষ্যৎ হতে ছুটে এসেছি সুমিকে বাঁচাতে…”


সঙ্গে সঙ্গে সিধান্ত নিয়ে নেয় আসফাক, সময় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে সে, আর এই কাজ সম্পন্ন করতে এই সমাজ হতে একদম দূরে চলে যাবে… 


~


২৭ বছর পর…


আসফাকের মস্তিষ্কে একই সাথে যেন দুটি ঘটনা খেলে যায়, সেদিন রাতে সিলিং ফ্যান খুলে সুমির এক্সিডেন্টের কিছুদিন পরেই আসফাক পাইকপাল নামক এক মফস্বল গ্রামে নিজের রিসার্চের ঘাঁটি তৈরি করে, পরিচিত সবাই আর সমাজ ফেলে চলে আসে এখানে। এই গ্রামে আসফাক আগে কোন দিন আসেনি কিন্তু তবুও কেন যেন আসফাকের মনে হয় এইখানে সে আগেও এসেছে, এই মানুষ গুলোকে সে আগেও দেখেছে, কিন্তু মস্তিষ্কের এই স্মৃতি গুলো খুব দূরে থেকে হানা দেয় আসফাককে, এগুলো খুবই ঝাপসা। 


নিজের তৈরি টাইম মেশিনের সামনে দাড়িয়ে আছে আসফাক, বারবার মনে হচ্ছে এই মেশিনটার সামনে সে যেন আগেও একবার এসে দাঁড়িয়েছে, দীর্ঘ সময় নিজের যুক্তির সাথে নিজে নিজে তর্ক করার পর আসফাক একটি সিধান্তে আসে আর তা হল, সেদিনের ফোন কলটা সম্পূর্ণ সত্যি ছিল, আসফাক এই নিয়ে তার জীবনে দ্বিতীয় বারের মতন টাইম ট্রাভেল করছে, আর তাই দুটি সময়ে ঘটে যাওয়া দুটি স্মৃতি প্যারালালি অবস্থান করছে আসফাকের মস্তিস্তকে !


মেশিনে উঠে সময় ভ্রমণ করার আগ মুহূর্তে আরও একবার কিছু একটা ভাবল আসফাক, তারপর ঠিক করল অতীতে গিয়ে তাকে কি করতে হবে, প্রথম সময় ভ্রমণের ভুল এবার করা যাবে না। সুমিকে তার বাবার বাড়ি পাঠানো যাবে না কোন ভাবেই, আর তাই আসফাক ২৭ বছর আগের সেই রাতে না গিয়ে সময়কে ঠিক করল ২৭ বছর আগের ঠিক দিনের বেলায়। তারপর হাতের সামনের লাল বোতামটি চেপে ধরল, সেই সাথে এক বিশাল আলোর ঝলকানিতে হারিয়ে গেল সে… 


~


জ্ঞান আসার পর আসফাক উপলব্ধি করল এই মুহূর্তে ২৭ বছর আগের অতীতে অবস্থান করছে সে, দ্রুত বাইরে বের হয়ে এল আসফাক। মাত্রই সকাল হয়েছে, চারিপাশে সমস্ত দোকান-পাট বন্ধ, নির্জন রাস্তা, কিন্তু আসফাকের বেশ পরিচিত এই রাস্তা গুলো, স্মৃতির পাতায় এই ছবি খুব সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে আসফাক। 


অল্প কিছুদূর হেটে একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল আসফাক, দোকানদার মাত্রই দোকান খুলছেন, আসফাককে দেখে একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল সে। উস্ক-খুস্ক কাঁচা-পাকা চুল, প্রায় সাদা হয়ে আসা  দাড়ি, কেমন যেন হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টির একজোড়া চোখ। 


পুনরায় দোকান খোলার জন্য হাত লাগাল দোকানদার আর কিছুক্ষণ পরেই খুসখুসে গলার একটা কণ্ঠ কানে ভেসে আসল তার, “ভাই একটা ফোন করা যাবে! খুব দরকার…” 


দোকানদার লক্ষ্য করল তার সামনে দাড়িয়ে থাকা উদ্ভাস্তের মতন লোকটা হাতে একটি ৫০০ টাকার নোট তার  দিকে তাক করে দাড়িয়ে আছে, লোকটার চোখের দৃষ্টিতে কি যেন একটা ছিল, দোকানদার তাকে কোন প্রশ্ন করল না, পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে লোকটার হাতে দড়িয়ে দিল। 


দোকানদারের কাছ হতে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল আসফাক, তারপর বলল, “একটা বেনসন সিগারেট দিন”, দোকানদার একটা আমান প্যাকেট ছিঁড়ে আসফাকের হাতে একটি সিগারেট ধরিয়ে দিতেই সিগারেট জ্বালিয়ে সামান্য দূরে সরে গেল আসফাক। 


দোকানের ড্রয়ারের উপর পাঁচশ টাকার নোটটা পড়ে আছে, দোকানদার লক্ষ্য করল চকচকে পাঁচশ টাকার নোটটা নতুন কিন্তু এটাকে দেখতে কেমন পুরনো লাগছে, মনে হচ্ছে কেউ বহু বছর এই টাকাটা আলাদা করে চাপা দিয়ে রেখেছিল, টাকাটা যে আসল সেটা পুনরায় ভাল করে দেখে মনের সন্দেহ দূর করল দোকানদার, তারপর কেতলিতে আগুন দিল সে। 


কেন যেন মনের মধ্যে অস্থিরতা নিয়ে নিজের নম্বরেই ডায়াল করল আসফাক, এইবার কোন ঝামেলা হলে চলবে না, এটা তার দ্বিতীয় সময় ভ্রমণ, সেই হিসেবে ৫৪ টি বছর পার করেছে আসফাক, শুধু একটি উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্য আর তা হল সুমিকে বাচাতে হবে তার! 


~


ভোর বেলা মোবাইল বাজার শব্দে ঘুম ভাঙ্গল আসফাকের, অপরিচিত একটি নম্বর হতে বারবার কে যেন ফোন করে যাচ্ছে, অনিচ্ছা সত্ত্বে ফোনটা ধরল আসফাক, কিন্তু ফোন ধরার সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ওপাশের কথা শুনে মুহূর্তে ঘুম উবে গেল, একজন ভারী পরিচিত কণ্ঠ বিড়বিড় করে আসফাকের ল্যাবের পাসওয়ার্ড বলছে, “********” আসফাক খুব ভাল করেই জানে আসফাক ছাড়া এই পাসওয়ার্ড জানা অন্য কারো পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার! 


— কে আপনি? বিচলিত হয়ে ফোনের ওপাশের মানুষটাকে প্রশ্ন করল আসফাক। 

— আমি কে এটা বুঝতে তোমার এত সময় কেন লাগছে আসফাক? ফোনের ওপাশের মানুষটার পাল্টা প্রশ্নে আরও বিচলিত হয়ে গেল আসফাক। আসফাক পুনরায় কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই ওপাশের মানুষটার কণ্ঠ শুনতে পেল সে। 


— আমি তুমি! আমি আসফাক!  ২৭ বছর পরের ভবিষ্যৎ হতে এসেছি, আমি যা বলি সেটা খুব মনোযোগ সহকারে শোন। হিসেবে এটা আমার দ্বিতীয় সময় ভ্রমণ, এই সময় ভ্রমণের উদ্দেশ্য সুমিকে বাঁচানো। আজ রাতে সুমিকে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে যাবার পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে তোমাকে, সুমিকে ঘর হতে বের হতে দেয়া যাবে না, তা না করলে সুমি মারা যাবে। প্রথম বার গাড়ি দুর্ঘটনায় আর দ্বিতীয় বার বাবার বাড়িতে সিলং ফ্যান খুলে সুমি মারা গেছে, সুতরাং সুমিকে এবার আর ওই বাড়িতে নেয়া যাবে না, ওখানেই ওর মৃত্যু লেখা, সুতরাং যদি আমরা সুমিকে এই স্থান হতে সরিয়ে রাখতে পারি তাহলেই ওকে বাঁচাতে পারব। 

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেও, সমস্ত কথাই খুব সাবধানে বলেছে আসফাক, যেন অতীতের আসফাক তার 

কথাগুলো ধরতে পারে। 


ফোনের ওপাশের লোকটার কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল আসফাক কিন্তু অবিশ্বাস করল না, লোকটার কথার ধরন, বাচনভঙ্গি সব কিছুই আসফাকের মতন। আর লোকটা আসফাকের ল্যাবের যেই পাসওয়ার্ড বলেছে সেটা একটি অকাট্য প্রমান ! কিন্তু মনের মধ্যে আসফাকের অবিশ্বাসের প্রশ্ন, সময় ভ্রমণ কি সত্যি সম্ভব? 


— তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ? ফোনের ওপাশ থেকে পুনরায় সেই কণ্ঠটা শুনতে পেল আসফাক।


আসফাক তার ভবিষ্যৎ পরিচয় দেয়া মোবাইলের ওপাশের মানুষকে মুখে কিছু বলতে পারল না, শুধু একটি শব্দ করল মাত্র, “হু”


লোকটা সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কেটে দিল। আসফাক দেখল সে রীতিমতন ঘামছে, গেঞ্জি সম্পূর্ণ ভিজে গেছে তার, পাশেই সুমি সম্পূর্ণ ঘুম, সুমিকে দেখে ভয়ে কলিজা যেন শুকিয়ে গেল আসফাকের, আজ রাতে সুমি মারা যাবে? হায় খোদা... 


~


ব্যাগের মধ্যে হতে বাইনুকুলার বের করে সুমি আর আসফাকের বাড়ির সামান্য দূরে অবস্থান করল ভবিষ্যৎ হতে আসা আসফাক, রাত অব্দি সময় আছে তার কাছে, সুতরাং কি হয় দেখে যেতে হবে। 


~


সকালে উঠে বেশ অবাক হল সুমি, আসফাক বিছানায় নেই, একটু হেটে সামনে যেতেই লক্ষ্য করল আসফাক বারান্দায় বসে কি যেন ভাবছে। সাধারণত আসফাক প্রায়ই রাত জেগে কাজ করে, তাই সকাল সকাল কখনই উঠতে পারে না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসফাককে জোর করে ঘুম থেকে তোলে সুমি। যদিও সুমি এই বিষয়টা খুব উপভোগ করে কিন্তু আসফাককে সকালে ঘুম থেকে জাগানো বেশ কঠিন কাজ। 


কিন্তু আজ সেই মানুষটা সুমির আগে ঘুম থেকে উঠে বসে আছে ! ব্যাপার কি? 


— তুমি ঠিক আছো তো? কোন সমস্যা? বেশ চিন্তার স্বরে আসফাকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল সুমি। 

আসফাক ঠিক নেই, মহা সমস্যা আর বিরাট চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু এই সমস্যার কথা সুমিকে বলা সম্ভব নয়। আসফাক নিজের মনের কথা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক হয়ে বলল, “তেমন কিছু না, আজ কেন জানি অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না, তোমার সাথে সারা দিন একা কাটাতে ইচ্ছে করছে” 


আসফাকের কথা শুনে একটু অবাকই হল সুমি, সুমি জানে আসফাক সুমিকে তার জীবনের থেকেও বেশী ভালবাসে কিন্তু রোমান্টিক পুরুষ সে কখনই নয়, আসফাকের মুখে এই ধরনের কথা কেন যেন অন্য রকম মনে হল সুমির কাছে। আসফাককে সুমি বহু বছর ধরে চেনে, সুতরাং আসফাকের স্বভাব বহির্ভূত কোন কাজ সুমির চোখে পড়বেই। 


সুমি ভ্রু কুঁচকে আসফাককে জিজ্ঞাস করল, কিন্তু আজ না বাবার বাসায় যাবার কথা আমাদের? 

সুমির কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সুমির হাত ধরে ফেলল আসফাক, তারপর বলল, “আজ বাদ দাও, দুইজন একসাথে আজকের দিনটা কাটাই…” 


আসফাকের এমন ব্যাবহারে আরও অবাক হল সুমি, কিন্তু কিছু বলল না সে, একটা বিসৃত হাসি দিয়ে আসফাকের চুল গুলো এলোমেলো করে বলল, “আজ কাল দেখছি তুমি বেশ রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছ!” 

এটুকু বলে চলে গেল সুমি, কিন্তু মনের মধ্যে তার খচখচ করতে লাগল আসফাকের এই অচেনা ব্যাবহারে। 


~


সন্ধ্যা নামছে, দূর হতে আসফাক তাকিয়ে আছে নিজের অতীতের দিকে, সুমি আর আসফাকের চালচলন দেখে মনে হচ্ছে ওরা আজ বাইরে বের হবে না। বিষয়টা আঁচ করতে পেরে একটু সস্থির নিঃশ্বাস ফেলল দূরে বাইনুকুলারে তাকিয়ে থাকা আসফাক। পাশের এক মসজিদে ওয়ায মাহফিলের আয়োজন চলছে, ইতিমধ্যে ওয়াজ শুরু হয়ে গেছে, কোন এক বক্তার কথা কানে ভেসে আসছে, যদিও সেই মুহূর্তে আসফাকের নজর আর ধ্যান দূরে অন্যদিকে। 


~


সারা দিন আসফাক সুমিকে নিয়ে নিজেদের মতন কাটিয়ে দিলেও বিকেলের দিকে বাইরে হেটে আসার বায়না ধরল সুমি, বলল “চল একটু বাইরে গিয়ে বাতাস খেয়ে আসি, সারা দিনই তো বাসায় কাটিয়ে দিলে।” 

সুমির  কথাটা শুনে বুক ধুঁক করে উঠল আসফাকের, না… না… সুমিকে আজ কোন ভাবেই বাড়ির বাইরে বের করা যাবে না। সুমির এই কথার উত্তরে কি বলবে এই চিন্তা করতে লাগল আসফাক। সুমি লক্ষ্য করল আসফাক কোন কথা ছাড়া সুমির দিকে তাকিয়ে আছে, সুমি পুনরায় আসফাককে জিজ্ঞাস করল, “কি? কথা বল না কেন?” 


আসফাক ঘোর ভেঙ্গে সুমির চোখের দিকে তাকাল, তারপর বলল, যাওয়া যেত কিন্তু আমি তো অন্য পরিকল্পনা করেছি?


আসফাকের কথা শুনে সুমি ভ্রু কুঁচকে বলল, কি পরিকল্পনা? 


রাতে দুজন ভাল মন্দ খাব, তোমার হাতের পোলাও আর কোরমা খেতে ইচ্ছে করছে, আর তার সাথে চাটনি, অনেক দিন খাই না, আজ দুজন আর বের না হই। আসফাক বেশ কাকুতি নিয়ে কথা গুলো বলল সুমিকে। বাইরে যেতে আসফাক সর্বদা মাহের, ঘরের হাজার রান্না থাকলেও সে বাইরে গিয়ে খেতে পছন্দ করে, কিন্তু আজ সে কিনা ঘরে খাবে তাই বাইরে যেতে চাইছে না, হয়েছি কি আসফাকের? সুমির মনে প্রশ্ন দানা বাদে। 


যদিও সুমি আসফাককে কিছু বলল না, ওর কথা মতন রাজি হয়ে গেল, তারপর ফ্রিজ হতে কোরমার জন্য গোস্ত আর পোলাও বের করে রাতের খাবার তৈরি করতে হাত লাগাল। 


~


নিশ্ছুপ হয়ে দূরে সুমি আর আসফাকের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছিল ২৭ বছর ভবিষ্যৎ হতে আসা আসফাক, আজকের রাতটা সুমিকে আটকে রাখতে পারলে ব্যাস কাজ হয়ে যাবে তার। এত দিনের কষ্ট সাধন হবে। ইতিমধ্যে পাশের মসজিদের ওয়াজ বেশ জমে উঠেছে, মানুষের কাছে বেশ বাহাবা পাচ্ছেন বক্তা, যদিও বক্তার কোন কথাই কানে যাচ্ছে না আসফাকের। 


ঠিক এমন সময় দূরে সুমির রান্না ঘর হতে কিছু জ্বলজ্বল করার আলো চোখে আসল আসফাকের, দ্রুত দূরবীনে চোখ লাগাল আসফাক, স্পষ্ট দেখল সুমির রান্না ঘরের ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন লেগেছে, গ্যাসের চুলোর সিলিন্ডারটার উপড়ে জ্বলে ওঠা আগুন চারপাশে হু হু করে জ্বলছে, সেই সাথে দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে সুমিও। কানে শব্দ না আসলেও আসফাকের বুঝতে অসুবিধা হল না, অতীতের আসফাক উন্মাদের মতন চিৎকার করছে, ইতিমধ্যে সে সিলিন্ডারের আগুন নিভিয়ে ফেললেও সুমির হাল বেগতিক, ধীরে ধীরে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ চলে এসেছে, সুমিকে বার্ন হবার প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে দিতে নিচে গাড়ি স্টার্ট দিতে গেল আসফাক, বাড়ির চারপাশে মানুষের অস্থিরতা, আসফাক গাড়ি স্টার্ট দিল, পাশের বাড়ির এক মহিলা সুমিকে নিয়ে উঠে বসল গাড়ির পেছনের সিটে। ধীরে ধীরে গাড়িটা হারিয়ে গেল রাস্তায়। 


বাইনোকুলারে সম্পূর্ণ ঘটনাটা দেখার পরে একদম বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল আসফাক, কি হল কিছুই যেন তার মস্তিষ্কে আসছে না, যা ঘটে গেছে সেটা যেন বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে তার ! 


হঠাৎ পাশের মসজিদে ওয়ায মাহফিলের বক্তার একটা কথা হুট করে কানে আসল বিজ্ঞানী আসফাকের, “মানুষের হায়াত নির্ধারিত, রিজিকে যা লেখা যা আছে তার বেশী একটা ভাতও সে খেতে পারবে না!” 


কথাটা শুনে ক্রোধে ফেটে পড়ল আসফাক, তারপর বিড়বিড় করে বলল, “সুমিকে আমার বাঁচাতে হবেই, আমি এই হায়াত মানি না!”

চলবে… 


লেখকঃ Sahel Rahman



গল্পঃ #হায়াত/পর্বঃ ১/ সাহিল রহমান

#হায়াত



পর্বঃ ১

বাংলাদেশের অন্যতম তরুণ নামকরা সায়েন্টিস্ট ডঃ আসফাক, হঠাৎ করেই করেই উধাও হয়ে গেছে। নিজের সকল স্টাডি, রিসার্চ, কনফারেন্স একদম বন্ধ করে দিয়েছে, প্রায় দুমাস হতে চলেছে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস পর্যন্ত নিচ্ছে না। 


আসফাকের স্ত্রী সুমি রোড এক্সিডেন্টে মারা যাবার পরে একদম বিষণ্ণ আর হতাশ হয়ে পরেছে সে, সকলের সাথেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। 

আসফাকের এভাবে সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবার বিষয়টি তার প্রফেশনাল মানুষজন এবং বন্ধু-বান্ধব সাধারণ ভাবে নিয়েছিল, কারণ আসফাকের জন্য এই শোক মেনে নেয়া যে বেশ কঠিন হবে এটা সবাই জানত। স্ত্রীকে অসম্ভব রকমের ভালবাসত আসফাক, দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে হয়েছিল ওদের কিন্তু বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় সুমি। 

নিজেকে এই কঠিন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে এবং ধীরে ধীরে মানুষিকভাবে শক্ত হতে আসফাকের কাছের মানুষগুলো আসফাককে এতদিন একা থাকতে দিয়েছে, সর্বদা খোঁজ খবর নিলেও কেউই আসফাককে খুব বেশী ঘাটায়নি, কিন্তু আজ আসফাক যেটা করছে সেটার পর আসফাকের সাথে সরাসরি কথা বলাটা বেশ জরুরী, এটাকে পাগলামো ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না…


~


ঢাকা ইউনিভার্সিটির কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিভাগীয় প্রধান নূর হক নিশ্চুপ হাতে দুটি কাগজ ধরে বসে আছেন, টেবিলের উপর সাদা খোলা খামটা কিছুক্ষণ আগে তার উদ্দেশ্যে এসেছে, যেই খামটা এখনো ফ্যানের বাতাসের সাথে সাথে হালকা দুলছে, খামটা খোলার পর নূর হক যেটা পড়লেন সেটা পড়ে মারাত্মকভাবে মর্মাহত হয়েছেন তিনি। 

খামের মধ্যে দুটো কাগজের মধ্যে একটি আসফাকের পদত্যাগ পত্র আর আরেকটি ছোট একটি চিঠি, যেখানে লেখা, 


“স্যার আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন, আমার পক্ষে ক্লাস আর রিসার্চ চালিয়ে যাওয়া সম্বব নয়, আমি সমাজ হতে দূরে চলে যাচ্ছি, হয়ত আপনাদের সাথে আর দেখা হবে না, হয়ত হবে… 

আগামীতে কি হবে, জানি না… 

আর জানার কথাও না… 

মানুষের জীবন, সময়ের মতনই অনিশ্চিত…”


চিঠির শেসে আসফাক তার নাম উল্লেখ করেনি, আর নাম উল্লেখ করার কোন প্রয়োজনও নেই। আসফাকের হাতের লেখা নূর হক খুব ভাল করেই চেনেন। চিঠিটা শেষ করার কিছুক্ষণ পরে দুটি নম্বরে কল করলেন নূর হক, যদিও তিনি জানেন এতে কোন লাভ হবে না, আসফাক যেই সিধান্ত নিয়েছে, সেটা সে করবেই, তাকে সেখান থেকে কেউই ফেরাতে পারবে না। তা না হলে আসফাক সরাসরি নূর হককে চিঠি লিখত না… 


~


সুমির বাবা আর আসফাকের বন্ধু বদি, নূর হকের ফোন পাবার পর দ্রুত ছুটে যায় আসফাকের বাসায়, কিন্তু ততক্ষণে আসফাক তার ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে, কোথায় গেছে সেটা জানে না কেউই। ফ্ল্যাটের চাবি আসফাকের শ্বশুরের কাছে থাকার কারণে সহজে দরজা খুলে প্রবেশ করল ওরা কিন্তু সেখানে আসফাককে দেখা গেল না। 

আসফাক আর সুমির সাজানো ফ্লাটটা খাঁ খাঁ করছে, মেয়েকে হারিয়ে সুমির বাবা কষ্ট পেলেও মেয়ের জামাই এর এমন মানুষিক অবস্থায় বেশ ভেঙ্গে পড়লেন তিনি, ঠা হয়ে দাড়িয়ে রইলেন  আসফাকের বাড়ির সামনের ঘরের আলনা ধরে। 


আসফাকের বন্ধু বদি পাগলের মতন সমস্ত ঘর আসফাককে খুঁজে বেশ সময় পর হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির হল সামনের ঘরে, লক্ষ্য করল সুমির বাবা দিশেহারা নজরে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, একটি মৃত্যু কিভাবে তছনছ করে ফেলল দুটি পরিবার, এই ভেবে বুকের মধ্যে চিনচিন এক ব্যাথা অনুভব করল বদি… 


~

সুমি আসফাকের জন্য শুধু মাত্র প্রেমিকা বা স্ত্রী ছিল না, সুমি ছিল আসফাকের জন্য জীবন। সুমি ছাড়া নিজেকে কোনোদিনও চিন্তা করতে পারে না আসফাক আর পারবেও না। ছোট কালে বাবা-মা হারানো অনাদরে বড় হওয়া আসফাকের মরুভূমিময় জীবনটায় সুমিই ছিল এক মাত্র বৃক্ষ। ভার্সিটির প্রথম দিন সুমির সাথে দেখা হবার পর হতে আসফাকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল তার, সেদিনের পর আসফাকের সকল কষ্ট নিজের করে নিয়েছিল মেয়েটি। জীবনটা একদম বদলে দিয়েছিল, আজকে আসফাকের এই নাম, এই খ্যাতি সমস্ত কিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে সুমির অবদান। আসফাক কে বিয়ে করার জন্য নিজের বাবা মায়ের সাথে রিতিমতন যুদ্ধ করেছিল এই সুমি। 


কিন্তু আজ আসফাক কে একা রেখে চলে গেছে সে, চলে গেছে না ফেরার জগতে। সুমির নিজ হাতে সাজানো এই ঘরে বসে বসে দীর্ঘ দুই মাস ধরে চিন্তা করেছে আসফাক, আর এই চিন্তা থেকেই এই সিধান্তে উপনীত হয়েছে সে। আর তা হল আসফাক সুমিকে ফিরিয়ে আনবে, আর তাই সকল মানুষ আর সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে হবে তাকে… 


আসফাক খুব ভাল করেই জানে পৃথিবীর বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী টাইম ট্রাভেল করতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু আজও পৃথিবীতে এই চেষ্টা বিদ্যমান। সুমিকে ফিরিয়ে আনতে হলে এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আসফাকের কাছে, প্রয়োজনে সে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবে । আর সেই চেষ্টা করতে বাংলাদেশের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নামকারা তরুণ সায়েন্টিস্ট রওনা হয় গহীন অজানা এক স্থানের উদ্দেশ্যে…


~


২৭ বছর পর… 


মফস্বল শহরের কাছেই ছোট একটি গ্রাম পাইকাল, এখানের সহজ সরল সকল মানুষ আসফাককে পাগল মেকানিক হিসেবেই চেনে, এই মানুষটার সারা বাড়ি ভর্তি শুধু অগোছালো বিভিন্ন রকমের সরঞ্জাম, যেগুলোর মাথা মুণ্ডু কিছুই বোঝে না তারা। কিন্তু এই গ্রামের মানুষগুলো খুব ভালোবাসেন আসফাক নামের পাগল মেকানিক কে। বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যাবহার করে গ্রামের মানুষের জিবিন খুব সহজ করে তুলেছে এই পাগল মেকানিক। 


আসফাকের এই গ্রামে আসার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আসফাকের পরিকল্পনা নিয়ে মাথা ঘামানোর কেউই নেই এই গ্রামে, ওদের কাছে আসফাক  একজন পাগল মেকানিক ছাড়া আর কিছুই না। 


এতটা বছর এই গ্রামে থেকে গ্রামের মানুষের সাথে বেশ সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলেও আসফাকের এখান থেকে যাবার সময় হয়ে এসেছে, আসফাকের উদ্দেশ্য আজ প্রায় সফলের পথে, দীর্ঘ ২৭ বছর গবেষণার ফসল টাইম ট্রাভেলের যন্ত্র আজ তৈরি, আসফাক এবার ফিরে যাবে ঠিক ২৭ বছর পেছনে, সেই দিন যেদিন মর্মান্তিক এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করেছিল আসফাকের স্ত্রী সুমি। সেদিনের স্মৃতি আসফাকের চোখে আজও জ্বলমান, 


সুমির বাড়িতে সুমির বাবার সাথে দেখা করে আসার পথে বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে আসফাকের গাড়ি। আসফাক বেচে গেলেও সুমি বাঁচে নি। সেদিন আসফাক দুই বার করে সুমিকে বাপের বাড়ি থেকে যাবার কথা বলেছিল, কিন্তু সুমি শোনে নি। এবার এই ভুল আর করবে না আসফাক, এবার সুমিকে তার বাবার বাড়িতে রেখে আসবে সে। আর সেই সাথে চিরতরে পরিবর্তন হয়ে যাবে আসফাকের জীবন। সুমির সাথে আবার শুরু হবে আসফাকের সংসার।


ঘড়িতে ঠিক রাত ৮ টা বেজে ৪০ মিনিট, নিজের হাতে তৈরি যানে বসে সমস্ত কিছু একবার দেখে নিল আসফাক, তারপর হাতের সামনে লাল বোতামটি চেপে ধরল, সেই সাথে এক আলোর ঝলকানিতে হারিয়ে গেল সে। 


~


চোখ খুলে তাকাল আসফাক, সে কতক্ষণ বেহুঁশ ছিল সেটা সে নিজেও জানে না, কিন্তু আসফাক যে সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে এসেছে এটা নিশ্চিত, নিজে এই যানে ওঠার আগে জড় বস্তু সহ কিছু প্রাণীকে অতীতে পাঠিয়েছে আসফাক, ওদের দেখে এটা নিশ্চিত হয়ে গেল সে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে মৃদু হাসল আসফাক, সে এই মুহূর্তে ২৭ বছর পূর্বের অতীতে অবস্থান করছে, আজ রাত ৯ টা ৩০ মিনিটের আগেই নিজের কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে আসফাক কে। 


ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত নিজের আসল কাজের উদ্দেশ্যে রওনা করল আসফাক। 


~


সুমির বাসার নিচে গিয়ে প্রথমে নিজ গাড়ির টায়ার পানচার করল আসফাক, তারপর একটি অজানা নম্বর হতে নিজ নম্বরে কল করল সে। 


সুমির সাথে রাতের খাবার খেয়ে সুমির বাবার সাথে গল্প করছিল আসফাক, গল্পের ফাকে দুই বার আসফাক সুমিকে বলল, এই তুমি চাইলে আজ এখানে থেকে যাও, আমার কোন সমস্যা হবে না। 


আসফাকের কথায় সুমির একই উত্তর, আরে না, যাই , আজ বাসায় অনেক কাজ পড়ে আছে। সুমিকে আর কিছু বলল না আসফাক, সুমি বাড়িতে এলেই আসফাকের জন্য ভাল, একা বাড়িতে ভাল লাগে না তার। ঠিক এই সময় একটি অচেনা নম্বর হতে ফোন পেয়ে ফোনটা ধরল আসফাক, ফোনের ওপাশের কথা শুনে মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার, কেমন যেন পরিচিত একজন বয়স্ক মানুষের গলা, 


লোকটা গড়গড় করে কিছু কথা বলল, যার প্রথম কথাটা ছিল, 

“তোমার ল্যাবের পাসওয়ার্ড ***** যেটা তুমি ছাড়া কেউ যানে না, এমনকি সুমিও না। তার মানে বুঝতে পারছ আমি কে, আমি আসফাক ২৭ বছর ভবিষ্যৎ হতে ছুটে এসেছি সুমিকে বাঁচাতে। আজ রাত ৯.৩০ মিনিটে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাবে সুমি, সুতরাং সুমিকে তুমি আজ এখানেই রেখে আসবে। তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর সেজন্য তোমার গাড়ির চাকাটা পানচার করে দিয়েছি আমি, এখন রাখি, আমার হাতে সময় কম!” 


ফোনটা কেটে যাবার পর কিছুক্ষণ একদম হতভম্বের মতন চুপ করে বসে রইল আসফাক, তারপর নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল সে, আসফাক কে উঠে দাড়াতেই সুমি বলল, “কি হল, দাঁড়ালে যে, কোথায় যাচ্ছ ?”

সুমির দিকে তাকাতেই কলিজা কামড়ে উঠল আসফাকের, কিছুক্ষণ আগে ফোনে বলা সেই মানুষটার কথাটা মনে হয়ে গেল তার। 


সুমির প্রশ্নে খুব দ্রুত উত্তর দিল আসফাক, “সুমি, শোন, আজ তোমাকে এখানেই থাকতে হবে, বদি ফোন করেছিল, ওর  মায়ের শরীরটা খারাপ, ওর বাসায় যেতে হবে।” 


“কি হয়েছে বদির মার…” এটুকু বলার পরেই সুমিকে থামিয়ে দিল আসফাক,  “তেমন কিছু না… আমি যাই হ্যাঁ… 

আগামীকাল ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে তোমাকে নিয়ে যাব…” 

এটুকু বলেই সুমির বাবার বাসা হতে বের হয়ে গেল আসফাক, গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, দেখল সামনের দুটো চাকাই পানচার, নিশ্চুপ হয়ে আরও কিছুটা সময় গাড়ির সামনে দাড়িয়ে থেকে, বের হয়ে রাস্তায় এল। এদিক সেদিক তাকাল কয়েক বার। কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগের ফোনটা সম্পূর্ণ মাথা জ্যাম করে দিয়েছে। কিন্তু  লোকটা যেই পাসওয়ার্ড বলেছে সেটা সঠিক, এটা যে আসফাক ছাড়া আর কেউই জানে না সেটাও সঠিক। 


একটা সি.এন.জি ঠিক করে উঠে বসল আসফাক, দূর হতে আসফাকের দিকে বাইনুকুলার দিয়ে তাকিয়ে রইল ২৭ বছর ভবিষ্যৎ হতে আসা আসফাক নিজেই, লক্ষ্য করল আসফাকের সাথে সুমি নেই। তারমানে সুমি তার বাবার বাড়িতে থেকে গেছে। মনের মধ্যে অস্থিরতা কমে আসল আসফাকের, সে ধীরে ধীরে সঠিক সময়ে যাবার জন্য তৈরি হতে থাকল। জীবন এখন পরিবর্তন হয়ে যাবে সেই আশায়… 


~


সেদিন গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারল না আসফাক, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বই গুলো বারবার করে দেখল সে, সময় ভ্রমণ কি সত্যিই সম্ভব ! যে ফোন করেছিল সে কি সত্যিই ভবিষ্যৎ হতে এসেছিল? এমন কিছু বিক্ষিপ্ত চিন্তা করতে করতে একটা সময় চোখ লেগে আসল আসফাকের। আর তারও কিছুক্ষণ পর মোবাইলের ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গল তার, সুমির বাবা ফোন করেছেন, এত রাতে সুমির বাবার ফোন পেয়ে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে ফোন ধরল আসফাক, ওপাশের কথা শুনতেই বুক ধড়ফড় করে উঠল, 


“আসফাক… বাবা তুমি দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে আস, ঘরের সিলং ফ্যান খুলে সুমির মাথায় পড়েছে, অবস্থা ভাল না…” 

সুমির বাবার কান্না জড়িত গলা শুনে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল আসফাকের… 


চলবে… 


লেখকঃ Sahel Rahman

Saturday, August 7, 2021

এম ডি মনিরের গল্প 'এক জোড়া চোখ'

 


এক জোড়া চোখ

এম ডি মনির 


ব্যাপারটা  এত দ্রুত ও রহস্যজনকভাবে ঘটে যাবে আমি শুধু চিন্তা করিনি তাইই না, পুরো বিষয়টি যেমন নাটকীয় তেমন অকল্পনীয়ও। নাটকীয় বা সিনেমেটিক যাই বলি না কেন আমার কাছে মনে হচ্ছে যে কোন উপমায় কম হয়ে যাচ্ছে। 


মাসখানেক আগের ঘটনা। আমি ঢাকা থেকে শ্যামলী পরিবহনে বাড়ি ফিরছিলাম।  

জার্নি করার ক্ষেত্রে আমি সব সময়ই দিনের আলো বেছে নিই। অবশ্য কারণ একটাই জানালায় মুখ রেখে এ বাংলার সবুজ শ্যামল মাঠ ঘাট নদী আর মায়াময় গ্রাম গুলো দেখতে দেখতে গাড়ি ভাড়ার পয়সা উশুল করা।  চিন্তা করে দেখুন মেহেরপুর টু ঢাকা পাঁচশ টাকা ভাড়া। আপনি রাতের আঁধারে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আর আমি সেই একই ভাড়ায় দিনের আলোয় নদী দেখছি ব্রীজ দেখছি৷ কতশত মানুষের মুখ। খেটে খাওয়া মুখ। দুঃখী মুখ। 

স্কুল ড্রেস পরা কিশোর কিশোরীদের অকারণে হেসে হেসে হেটে যাওয়া। সবুজে সবুজে ছেয়ে থাকা গ্রাম ----

আহা! 

আমি এই লোভ কিছুতেই সামলাতে পারিনা। 


যাইহোক ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেললাম। 

আমি শ্যামলী পরিবহনে বাড়ি ফিরছিলাম। সকাল নয়টায় গাড়ি ছেড়েছে। দুপুর নাগাদ ঝুম বৃষ্টি এলো। জানালার কাঁচে মুখ লাগিয়ে আমি বৃষ্টি দেখছি আর মনে মনে কত কথা যে ভাবছি তার হিসাব নেই। 


কুষ্টিয়া পর্যন্ত আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেলো। মহাসড়কে একটা এক্সিডেন্ট হয়ে রাস্তা ব্লক।  ড্রাইভার হটাৎ ডানে মোড় ঘুরে গাড়ি গলি রাস্তায় ঢুকিয়ে দিলো। এই গলি রাস্তা দিয়ে খানিকটা গেলেই আবার মহাসড়কে ওঠা যাবে। 


বৃষ্টি থেমে গেছে। গলি রাস্তায় খুব ধিরে ধিরে গাড়ি চলছে। আমি জানালা খুলে দিয়ে চুপচাপ বাড়ি ঘর দেখছি। হঠাৎ গাড়ির ব্রেক।  সরু রাস্তায় দ্বিমুখী যানবাহন যাওয়া সম্ভব না।  সামনে থেকে গাড়ি আসায় ব্রেক করেছে।  ঠিক তখনই ঘটে গেলো জীবনের সেরা মুহূর্তটা। রাস্তা লাগোয়া একটা বাড়ি। আমার জানালা সোজাসুজি আরেকটা জানালায় এক জোড়া চোখ!  ধবধবে সাদা মুখের উপর এক জোড়া চোখ!  

চোখ নয় যেন সাগর! 

আমি হঠাৎ কোন সাগরে পড়ে গেছি। আমি সাগরে সাঁতার কাটছি। 

তল নেই কুল নেই 

অথৈজলে ভাসছি যেন। 


মেয়েটা মুখ সরিয়ে নিতে পারতো। চোখ নামিয়ে নিতে পারতো। 

কিছুই করলো না। কার ইশারায় কে জানে সেও তাকিয়ে আছে আমার চোখে। 

দুজনেই পলকহীন 

দুজনেই ভাবলেশহীন 

কেমন বোকার মতো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছি দুজনে। 


যে কোন সময় গাড়ি টান দিতে পারে। 

কি করা উচিৎ আর কি বলা উচিৎ কিছুই ভাবতে পারছি না। 

বুকের ভিতর মোচড় দিচ্ছে। 

কেন জানি চোখে পানি চলে আসছে.।  কেন আসছে?  


মনে হচ্ছে শত সহস্র বছরের চেনা কোন নারী। এতদিন শুধু আমি আসবো বলে অনন্তকাল জানালার শিক ধরে অপেক্ষা করছিল। আমরা অনেক দিনের পরিচিত। অনেক দিন অনেক বছর পর আমাদের দেখা।  এত বছর পর দেখা হয়ে আমরা খুশিতে বাকরূদ্ধ হয়ে গেছি যেন। 


জানালাটা এতই কাছাকাছি ছিল যে ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে দেওয়া যেত৷ 

পকেটে আনকোরা নতুন একটা একশো টাকার নোট ছিল।  

টাকাটা বের করে দ্রুত আমার মোবাইল নাম্বার লিখে ফেললাম। 

ও চোখে তাকিয়ে বললাম


সার্চলাইটের মতো জ্বেলে 

এক জোড়া চোখ 

জানালার গ্রীলে রেখে হাত 

আবার দেখা হোক

পুড়ে যদি যায় যাক বুকের ভিতর 

তবুও তো পুড়বে কিছু শোক। 

এক জোড়া চোখ 

আবার দেখা হোক।। 


আমার মুখে কবিতা আবৃত্তির মতো কথা গুলো শুনে অবাক বিষ্ময়ে চোখ আরো বড় বড় করে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো।  তখনো আংগুলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক জোড়া চোখ। 


গাড়ি ছেড়ে দিলো। আমি টাকা টা জানালা দিয়ে মেয়েটির রুমে ছুড়ে দিলাম। 

দেখলাম মেয়েটি খুশিতে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো--- 


পড়ন্ত বিকেল। একটু আগেই থেমেছে বৃষ্টি। স্নিগ্ধ শান্তির হাওয়া বয়ে বয়ে যাচ্ছে। 

আমি চোখ বুজে ভাবছি 

এক জোড়া চোখ 

আবার দেখা হোক ---

Sunday, August 1, 2021

শরীফ আহমেদের লেখা গল্প ঃ ভুবন বিনাশী অবরোধ

 


ভুবনবিনাশী অবরোধ 

শরীফ আহমেদ 


মাথাটা টনটন করছে। মনে হচ্ছে একটা বেলুনের মতো প্রচণ্ড চাপ মাথার চামড়াগুলোতে। মনে হচ্ছে ফেটে যাবে সেই চাপে। যেমন করে বেলুন ফেটে যায়।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় মনির। নীরব রাস্তা। খুব কড়া লকডাউন চলছে। তার মাথার চাপ আরও বাড়ে। চলে আসে রুমের ভেতরে।
মাথাটা ব্যথা করে প্রচণ্ড। নিশ্চয়ই মনের মধ্যে কোনো দুশ্চিন্তা ফুঁসে উঠছে। সেজন্যই মাথার চাপ বাড়ছে। সেজন্যই ব্যথা করতে শুরু করেছে মাথা। দুশ্চিন্তাটাকে সে প্রাণপণে ফেরাতে চায়। 
মনে মনে বিড়বিড় করে, সব ঠিক আছে। সব ঠিক আছে। সব ঠিক আছে। সব ঠিক মতো চলছে। সব ঠিক মতো চলছে। সব ঠিক মতো চলছে।
কিন্তু ব্যথাটা কমতে চায় না। মাথার চাপ কমার আগেই দুশ্চিন্তাটা স্পষ্ট হয়। দোকানের ভাড়া দিতে হবে। গত মাসের ভাড়া দিয়ে হাতে কিছু নাই। সংসার চালানোই কঠিন। তার উপর এই মাসও শেষ হবে আগামীকাল। অথচ হাতে তেমন কোনো টাকা আসেনি এখনো। 
সাতদিন ধরে লকডাউনে দোকান বন্ধ। আরও নাকি সাতদিন বন্ধ থাকবে। 
বাসা ভাড়াও দিতে হবে ১০ তারিখের মধ্যে। কীভাবে কী করবে?
গতবছর দুই মাস লকডাউনের পর থেকে সব হিসাব গোলমাল হয়ে যায়। তখন একেবারেই কোনো বেচাকেনা হয়নাই। দোকানই খুলতে পারেনাই। দুইটা কর্মচারী দোকানে। লকডাউনের দুইমাস বেতন না দিলেও বছরের বাকি মাস ঠিকই বেতন দিতে হয়েছে। লকডাউনে ঢাকার স্টুডেন্টরা সব ঢাকার বাইরে চলে গেছে। কে শিখবে কম্পিউটার? কে আসবে কম্পিউটারে টাইপ করাতে? কে আসবে প্রিন্ট করাতে?
বছরখানেক ধরে ধুঁকে ধুঁকে চলছে ব্যবসাটা। তবুও সে ব্যবসায়ি। ব্যবসায়ি মানেই ধনী। কিন্তু লকডাউনের অবরোধ যে ব্যবসায়িকে নিঃস্ব করতে পারে, তা কে বুঝবে? আর শুধু এই অবরোধ কেন? অবরোধ আসার আগেও কি ব্যবসা ভালো ছিলো? গত ১০ বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে গতি নেই। সব ব্যবসায়ই মন্দা।

ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে মনির। ডান চোখের ডানপাশটায় নক দিয়ে চুলকাতে গেলে কী যেন একটা কেটে যায়। জ্বালা করে খুব। আবার আঙুল দিয়ে ছুয়ে দেখে জায়গাটা। একটা ফুসকুড়ি হয়েছে। সেটা কেটেই যন্ত্রণা। একদকে ভালোই হয়েছে। এই চোখের পাশের জ্বালা আর ফুসকুড়ির দিকে চিন্তাটা সরে গিয়ে মাথার চাপটা কমে একটু।
সে দক্ষিণের জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বাতাস আসছে। চারপাশ শুকনা। বৃষ্টি নাই দুইতিন দিন ধরে।
বৃষ্টিহীন শুকনো রাস্তা। দুইপাশের দোকানগুলো বন্ধ। বারান্দায় আবার দাঁড়ায় মনির। ধুঁ ধুঁ শূন্যতায় ভরে উঠে মনের সবটুকু খালি জায়গা। এখানে স্বপ্ন নাই কোনো। স্বপ্নের জন্য কোনো জায়গা খালি নাই। সব স্বপ্ন মরে গেছে ভুবনবিনাশী অবরোধে।

পরদিন হাঁটতে হাঁটতে পল্লবী শপিং কমপ্লেক্সে যায় মনির। খোঁজখবর নেয়। মার্কেট কবে খুলবে। দোকান কবে খোলা যাবে, সেটা বোঝার চেষ্টা করে। 
মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ডের সাথে কথা বলে। মার্কেট কমিটির পরিচিত একজনকে সাথে মোবাইলে কল দেয়। তার সাথেও কথা বলে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয় না। মার্কেট খোলার ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। 
দুইমাস আগের একুশদিন লকডাউন ছিলো। তখন নয়দিন পর মার্কেট খুলে দিছিলো। এখন নাকি খুলবে না। সামনে কুরবানির ঈদ। এই অবস্থায় দোকান বন্ধ থাকলে টাকা আসবে কোথা থেকে?
বাসার দিকে হাঁটতে থাকে মনির। মাথায় রক্ত উঠতে থাকে। ব্যথা শুরু হয় মাথায়। কী করবে? ডাক্তার দেখাবে? তাতেও তো ২-৩ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাবে।
বাসায় ফিরে আসে মনির। আল্লা আল্লা করে। বাচ্চাদের সাথে কথা বললে মাথার ব্যথাটা কমে। কিন্তু আবার মাথায় চাপ। বেলুনের চামড়ার মতো টান মাথার চামড়ায়।
বেডরুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। রোজা ঈদের আগে থেকে গত দেড়মাস দোকান চাকিয়ে ব্যাংকে যে কিছু টাকা জমা হয়েছে তা দিয়ে কর্মচারীদের ঈদ বোনাস দিতে হবে। বেতন দেওয়া যাবে না। বলতে হবে দোকান বন্ধ থাকলে বেতন দেওয়া যাবে না। অন্তত পনেরোদিনের বেতন কম দিতে পারলে, সে টাকা দিয়ে নিজের সংসারটা কোনোরকম চালানো যাবে।

Monday, July 12, 2021

আর. এ. খাঁন রনির গল্পঃ- "আপনার চেয়ে আপন"




গল্পঃ- "আপনার চেয়ে আপন"

- আর. এ. খাঁন রনি

এইত কিছুদিন আগে মারা গেলাম। কিছুদিন মানে কতদিন জানিনা। জানবইবা কিভাবে? বেঁচে থাকার সময়ে সময়ের হিসাব আর বর্তমানেরটার হিসাব এক না। আমার কিছুদিন হয়তবা ব্যস্ত পৃথিবীর কয়েকঘন্টা। আগে, মানে মৃত্যুর আগে, সেকেন্ডের কাঁটাটা শুধু সামনেই এগুতো। আর এখন সময় আস্তে আস্তে একটু এগোয়, কখনো থেমে যায়। ইচ্ছে হলে পিছিয়েও যায়। মাঝে মাঝে খুব দ্রুত ছোটে, কখনো খুব ধীরে, শামুকের মত, বিরক্তি ধরে যায়। 'শালার সময়।' মনে মনে একটা গালি দিই।

আমি যেদিন মারা গেলাম সেদিন বেশ সুন্দর হাওয়া ছেড়েছিল শহরটায়। ভীষন আপন লাগছিল ইট-কাঠের খাঁচাটাকে। হাতের মুঠোয় রাখা ছোট্ট একটা চড়ুইয়ের মত মায়া মায়া গন্ধ তার। দেখলেই চোখের আরাম হয়। অথচ বেশ কিছুদিন ধরেই আকাশে প্রচন্ড রোদ ছিল। বাইরে বেরুলে গা পুড়ে যায় অবস্থা। জানালা দিয়ে বাইরে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না, চোখ করকর করে উঠত। আকাশে আর বাতাসে পিপাসার্ত কাকদের নীরব আহাজারি। সে সময়টুকু ছিল কৃষ্ণচূড়াদের জন্য বড় অসময়। কেউ রোদের ভয়ে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল না তাদের দিকে। অবহেলিত কৃষ্ণচূড়ারা উদাস মনে বেঁচে ছিল গাছে গাছে।

অথচ আমি মারা যাওয়ার খানিক পর থেকেই শহরটা মায়ার শহর হয়ে যায়। রোদটা মাখনের মত নরম হয়ে আসে। সূর্যটা পৃথিবীর সাথে তার শত্রুতা ভুলে গিয়ে মুচকি হাসা শুরু করল। খালিচোখে দেখলে মনে হতে পারে আমার মৃত্যুর সাথে সাথে শহরটা অভিশাপমুক্ত হয়েছে। যদিও কথাটা ঠিক না হয়ত। আমার মনে হয় না আমি অভিশপ্ত ছিলাম।

কিভাবে মারা গেলাম তা আমার কাছেও খুব একটা পরিষ্কার না। রাতে সবার সাথে একসাথে বসে রাতের খাওয়া সারলাম, রুমে গিয়ে একটা বইয়ের দু'পৃষ্ঠা ওল্টালাম, একটা গানের তিন লাইন শুনলাম, কিছু ভাল্লাগছিল না। ইদানিং ঘুমরা দেরিতে আসে, ঘুমপাড়ানী মাসী-পিসীর ব্যস্ততা বেড়েছে হয়ত। শেষরাতে ঘুমাতে গেলাম। চোখের পাতায় আবছা ঘুম। সকালে বোধহয় একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি মারা গেছি। এরকম হঠাৎ করে মানুষ মারা যায়! না মরলে বিশ্বাস করতাম না।

মারা যাওয়ার ব্যাপারে আপনার যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা না থাকলে, প্রথমদিকে আপনি ভড়কে যেতে পারেন। আমিও ভড়কে গিয়েছিলাম। এটা অনেকটা হতাশার মত গ্রাস করে নেয়। তবে প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যাওয়ার পরই আমি মুগ্ধ হলাম। জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সকালটা দেখে মুগ্ধ হলাম। প্রথমেই মনে হল- সকালটা এত সুন্দর কেন? চারিদিক অদ্ভুত মায়া মায়া। আমার বারান্দা দিয়ে দূরের একটা ... গাছ দেখা যায়। গাছের কচি সবুজ পাতাগুলো সূর্যের আলোতে মিটিমিটি হাসছে। তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের কয়েক টুকরো লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের কাছে। বাইরের রাস্তাটা নদীর মত। যেন শান্ত একটা নদী। এখুনি নদীর বুকে টুপটাপ বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। কি অদ্ভুত মায়া নিয়ে বসে আছে পৃথিবী। অথচ অন্যান্য দিন হয়ত চোখেই পড়ত না। ঘুম থেকে উঠেই অফিসে দৌড়ানোর তাড়া থাকলে কারইবা চোখে পড়বে? আজকে আমার তাড়া নেই। মৃতমানুষদের তাড়া থাকে না। আমি চোখ ভরে সকাল খেতে থাকলাম।

মা হয়ত ঘুমাচ্ছেন। ফজরের নামাজের পরের গাঢ়, শান্তির ঘুম। তাকে জাগাবো কিনা ভাবলাম। মাকে গিয়ে বলব যে আমি মারা গেছি? তবে চোখ খুলেই এরকম একটা খবর শোনা উচিৎ হবে না বোধহয়। হার্টবিটের গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে। তাই তাকে আর জাগাতে গেলাম না। ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। তাছাড়া মৃত্যু কোন খুশির খবর না যে ঢাকঢোল বাজিয়ে বলে বেড়াতে হবে। আর এখন জানলেও জানবে, পরে জানলেও জানবে- একই কথা। এইসব ভাবতে ভাবতে রাস্তায় নেমে এলাম। বাইরে বৃষ্টির মত কুয়াশা পড়ছে। হাতের ছাপওয়ালা পাতলা নীল টিশার্টটা পড়ে আছি বলে হালকা শীত শীতও করছে। যেন শীতের সকাল।

রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। দানবগুলো এখনো ঘুমাচ্ছে হয়ত। পিচঢালা কালো রাস্তায় শিশিরের প্রলেপ দেয়া। বাতাসে জলের গন্ধ ভাসছে। বৃষ্টি নামতে পারে। যদিও আকাশে খুব একটা মেঘের আনাগোনা নেই, নীল রঙের আধিক্য সেখানে। নরম রাস্তার পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলি সামনে। ফুটপাতের বাম পাশের লাগোয়া গাছগুলোর শাখা বাতাসের প্রশ্রয়ে দুলতে থাকে, হেসে কুটিকুটি হয়। যেন খুব মজার কোন কথা শুনে মুখে শাড়ির আঁচল দিয়ে হাসছে তরুনীর দল। কুয়াশার কারনে সবুজ পাতাগুলো আরো সজীব, আরো সবুজ হয়ে আছে।

মাঝে মাঝে দু'একটা গাড়ি পাশ দিয়ে হুশহাশ বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের যাত্রীদের নিশ্চয়ই ভীষন তাড়া আছে। দেরি হলেই লোকসান হয়ে যাবে। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছিল, একটা একটা করে গাড়ি থামাই। থামিয়ে তাদের আকাশ দেখাই, সবুজ দেখাই। বাতাসের কথা শুনে গাছ কিভাবে হেসে ওঠে নিজ কানে শুনুক। কচি ঘাসের ডগার উপর ঘাসফড়িং কিভাবে ধ্যান করে দেখুক তারা। কিন্তু পরক্ষনেই এই চিন্তা বাদ করে দিলাম। পাগল বলে পুলিশে দিলে হয়ত মৃতমানুষ হয়েও পার পাবো না। ইদানিং নাকি তাদের মানিব্যাগের স্বাস্থ্য ভালো না। স্যালাইন দিয়ে রাখতে হচ্ছে।

ঢাকার পার্কগুলো ছোট হয়ে আসছে। সাথে সাথে আকাশটুকুও। আকাশ ছোট হলেও শহরের পার্কের পেশাদার বাদামবিক্রেতাদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। একটা পার্কের মর্যাদা নির্ভর করে তার বাদামওয়ালাদের উপর। বাদামওয়ালা হচ্ছে পার্কের শোভা। ফ্রান্সের শোভা যেমন আইফেল টাওয়ার, পার্কের শোভা হচ্ছে বাদামবিক্রেতারা। প্রেমিক-প্রেমিকারা এখন আর বাদাম খেয়ে প্রেম করে না। চাইনিজের নরম লজ্জিত আলোয় তারা প্রেম করে। তাই বাদাম ব্যবসার অবস্থা ভালো না। দেশের বাদামশিল্প আজ হুমকির মুখে। তবে আমার সামনের বাদামবিক্রেতাকে দেখে সেই কথা মনে হয় না। তার পরনে ফুলহাতা শার্ট, প্যান্ট। প্যান্টের হাঁটুর কাছে একটা তালি আছে যদিও। পায়ে জুতা। তার একপাটির মাথা দিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুল উঁকি দিচ্ছে। এটা নিয়ে সে যথেষ্ঠ বিব্রত অবস্থায় আছে। একটু পরপর আঙ্গুল জুতার ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাতে খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। একটু পরপর মাথা বের করে পার্কের আকাশ দেখছে। তার যে মালিক তাকে নিয়ে বিব্রত, তাতে কোন পরোয়া নেই।

'স্যার, বাদাম নিবেন?'
'না'
'নিতে পারেন স্যার। ভালো বাদাম, খাইলে বাড়িঘর ভুলে যাবেন। পার্কেই পড়ে থাকবেন দিন-রাত। আমারে দেখলেই ডাক দিবেন, মফিজদ্দীন বাদাম দিয়ে যাও।'
লোকটা বেশি কথা বলে। তবে তাতে করে মফিজদ্দীনের নাম জানা গেল। তার জুতার অবস্থা দেখে মায়া লাগছে। কিছু বাদাম কিনতে পারলে হয়। কিন্তু উপায় নেই।
'আমার কাছে টাকা নেই মফিজদ্দীন'
'পরে দিয়েন তাহলে। পাঁচ টাকার দিই? দিনের প্রথম কাস্টমার'
'পরেও টাকা থাকবে নারে। আমি মারা গেছি। মরা মানুষের টাকা-পয়সা থাকে না।'
শুনে মফিজদ্দীনের চোখ ছোট হয়ে আসে চাইনিজদের মত। কপালে ভাঁজ পড়ে।
'মারা গেছেনতো বাদামের দিকে চাইয়া থাকেন কেন? শুধুশুধু এতগুলান কথা বলাইলেন।'
সে দুপদাপ পা ফেলে অন্য দিকে হেঁটে যায়। বেচারার দিনের প্রথম কাস্টমারই মরা মানুষ। মফিজদ্দীনের কপালে আজকে খারাপি আছে। মরে যাবার জন্য এইপ্রথম আমার একটু আফসোস হল। আর কখনো খোসা ছাড়িয়ে কুটুস করে বাদাম খাওয়া হবে না। কখনো কখনো ভুলে বাদামের খোসাশুদ্ধ মুখে পুরে দেয়া হবে না।

বাসে ভীষন ভীড়। পা রাখারও জায়গা নেই। মোট সংরক্ষিত সিট বারটা- মহিলাদের জন্য নয়টা আর মৃতদের জন্য তিনটা। তিনটা সিটেই মৃত প্যাসেঞ্জাররা বসে ছিল উদাস উদাস চোখ মেলে। তিনজনের মধ্যে একজনকে আমার পুরোপুরি মৃত মনে হল না।

প্রিয় আড্ডা নগরে গেলাম। বরাবরের মতই বশির,আকাশ,মেহদী ভাই'রা বসে আড্ডায় মেতেছে। তবে আজকের আড্ডার ট্রপিকটা মনে হচ্ছে সচরাচরের চেয়ে ভিন্ন। বেশ প্রাফুল্য ফুটে উঠেছে তাদের মিলনায়তনে। আমাকে দেখেই সবাই স্বাভাবিক সুরে জিজ্ঞেস করল 'কিরে মারা গেলি কখন?' গত রাতেই। এমতাবস্থায় ইয়াসিন-মোমরাজও আসলো আড্ডায় যোগ দিতে। আর আমাকে বলল 'কিরে দেখেতো মনে হচ্ছে মারা গেছিস, আবার এখানে আসছিস কেন?' ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে 'কি আর করার?' বিদায়ই নিলাম। চির বিদায়!

কলেজে গেলাম। কুইজ ছিল একটা। ইকোনমিক্সের কুইজ। কিছুই পড়িনি অবশ্য। জাস্ট দেয়ার জন্যই যাওয়া। আর যদি কারোরটা দেখার সুযোগ মিলে তাহলেতো পাঙ্খা। ক্লাসের সবার মুখে একই কথা। 'কখন মারা গেলি?','কিভাবে মারা গেলি?' এক ফ্রেন্ড(উদয়) আফসোস করল। আমি মারা গেছি সেজন্য না। নিজে এখনও বেঁচে আছে বলে। বেঁচে থাকা মানেই- ক্লাস, ল্যাব,কুইজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও চিন্তা করে দেখলাম কথা মিথ্যা না। মরে গেছি ভেবে নিজেকে কিছুটা হালকাও মনে হল। ক্লাসে স্যার আসলেন। খাতা দিচ্ছিলেন একজন একজন করে। আমি খাতা নেয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। স্যার বললেন,'তুমি কবে মারা গেছ?'
সঠিক উত্তর জানা নেই। বললাম,'গতকাল রাতে।'
স্যার বললেন তাহলে আমার কুইজ দেয়ার দরকার নাই। বাসায় যেয়ে রেস্ট নিতে। আমি বেরিয়ে পড়লাম। আসার সময় দেখি আফসোস করা ফ্রেন্ডটার চেহারা কান্না কান্না হয়ে গেছে। বেচারা হয়ত কেঁদেই ফেলবে। আর জাহাইন্নাতো কথাই বলল না। অথচ ওর জন্য স্কুল জীবনে কত ঝামেলায় না পড়ছি শুধু ওরে বাঁচানোর জন্য। সব কয়টা স্বার্থপর।

পরক্ষনেই গেলাম রাবেয়ার সাথে দেখা করতে। ও রেগে ছিল।
'তোমার ফোনে রিং হয়। রিসিভ করো নাই কেন?'
'আমিতো মারা গেছি। রিসিভ করবো কিভাবে?'
'আজিব! মারা গেলে ফোন রিসিভ করা যায় না নাকি?'
আমি চুপ করে গেলাম। কথা বলা মানেই রাবেয়াকে আরো রাগানো। ও চোখ তুলে আমাকে ভালোভাবে দেখল।
'সত্যিই মারা গেছ তুমি? কবে?'
'কাল রাতে'
'তাহলেতো আমাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে। তাই না?'
'হু তাই'
রাবেয়াকে দুঃখী বা বিষ্মিত কিছুই মনে হয় হল না। অথচ মরে যাবার আগে যখন আমার একটু জ্বর কিংবা হালকা ঠান্ডাও লাগতো তখন রাবেয়ার কি আহামরি অবস্তায় না হয়ে যেত! আর এখন আমি মারা গেছি- এটা প্রিয়তমার কাছে যেন নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। এত দিনের রিলেশনের ইতিও কোন আহামরি ব্যাপার না। আমি আবার মারা যেতে চাইলাম।
যার কাছে আমি বাঁচতে এসেছিলাম সেই যদি গলা চেপে ধরে,আষাঢ়ের শেষ রাতে আমি কার কাছে যাবো?

দাড়িয়ে আছি অবকাশ প্রান্তরে। এ যেন কাপোল-কাপোলিদের চন্দ্রনাথ। জোৎস্নায় প্লাবিত চারিদিক। তিতাস । নদীর জল চিকচিক। মৃদুমন্দ বাতাস। ঢেউয়ের তালে দুলছে উন্মাতাল দুই হৃদয়। অভিসারে বেরিয়েছেন দু’জনায়। প্রথম প্রেম আজ পরিপূর্ণতা পাবে হয়তো…

খোলা ডেকে পাশাপাশি দু’জন। নারীর এলোচুল বাউরি বাতাসে এলোমেলো। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় পুরুষের চিবুক। ক্ষণিকের ছুঁয়ে যাওয়ায় সে যেন এক দিকভ্রান্ত নাবিক। হারিয়েছে পথের দিশা। তার খোলা বুক। ভিতর থেকে উকি দেয়া কালো পশমে ঢাকা চওড়া বুক, অজান্তেই ঢোক গিলতে বাধ্য করে নারীকে। জ্বলে ওঠে তার চোখ। ভিতর বাহিরে নারী অঙ্গারে পরিণত হয়। পুরুষের দিকে তাকায় একপলক। কোথায়ও কেউ নেই। চারদিকে নিঃসীম নিঃসঙ্গতায় ডুবে আছে চরাচর। একটু একটু ঢেউয়ের তালে দুলতে থাকা নিঃসঙ্গ বোটের দুই বিপরীত লিংগের মানুষ দু’জন ছন্দে ছন্দে একে অপরকে ছুঁয়ে যায়। কোথায় যেন জ্বলে যায়.. তবুও শান্ত.. কি এক ইংগিতের অপেক্ষায় মৌণ দু’জন!

নারীর অপেক্ষা সহ্য হয়না। কিন্তু দু’জনের ভিতরে কঠিন শপথ- কেউ কাউকে ছুঁবে না আগে। যে অগ্রণী ভূমিকা নেবে, তার হার হবে। তাই অসহ্য জ্বলনে কষ্টকর মুহুর্ত পার হচ্ছে নিঝুম নিমগ্নতায়!

পুরুষের শরীরের নিজস্ব ঘ্রাণে উদ্বেলিত নারী! কি এক অমোঘ আকর্ষণে একটু ঝুঁকে পড়ে সে পুরুষের দিকে। তার এক চোখ নিজের অবাধ্য চুলে ঢেকে আছে। অন্যটি পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। অস্ফুট নিরব মিনতি তার কাঁপন ধরানো চোখের তারায়। গোলাপী ঠোঁটের নিজেদের জোর করে চেপে রাখার অপপ্রয়াস হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয় নারীর সুরেলা কণ্ঠের ঝংকারে-

“ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রং হলুদ
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলা
ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা ।
সেই সাপটা বুঝি তুমি ?
না।
তবে ?
স্মৃতি।
বাসর ঘরে ঢুকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলে
পোড়া ধুপের পাশে।”

পুরুষ এতক্ষণ নিজের পৌরুষকে অবদমিত করে রেখেছিলো শপথের কঠিন নিষেধের বেড়াজালে। নিঃসঙ্গ যুবতীর শরীর ছাপিয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কামনার বহ্নিশিখারা, এক মায়াবী কোমল নারীর সুরেলা মধুমাখা আবৃত্তি শুনে-নিজেরাই নিজেদের শরীর পেট্রোলে ভিজিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়! জ্বলে ওঠে পুরুষের আপাদমস্তক.. সে বিস্ফারিত নেত্রে কল্পনায় নারীর শরীরের বাঁকে বাঁকে নিজের ভিতরের নিজকে অবগাহনরত দেখে। আপনাতেই তার মুখ দিয়ে বের হয়-

“বরফের কুঁচির মতন
সেই জল মেয়েদের স্তন!
মুখ বুক ভিজে,
ফেনার শেমিজে
শরীর পিছল!”

আরো একটু আসে নারী! নিঃশ্বাস ঘন দূরত্ব দু’জনের.. হৃদয়ের সিস্টোল-ডায়াস্টোল দামামা বাজিয়ে চলেছে.. নাকের পাটা ফুলে ফেপে একাকার.. কিছু একটা আটকে আসতে চায় গলার কাছে নারীর! মনে মনে বলে সে, ‘ধুর ছাই! জাহান্নামে যাক শপথ’.. মুখে বলে-

“তোমাকে দেখার মতো চোখ নাই, তবু,
গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই- তুমি
আজো এই পৃথিবীতে রয়ে গেছো।

নারী নিজেই সমর্পিত হয় পুরুষের বাহুডোরে.. রুপালী চাঁদ জোৎস্না কে বলে ধীরে বহো.. নদীর জলে চিকচিক করে নারীর কালো এলোচুল! পুরুষ নারীর বাঁকে বাঁকে রসুনের খোসার মতো পরতের পর পরত খুলে অবগাহন করে আর বলে, ‘হ্যা! আমি আজো এই পৃথিবীতে রয়ে গেছি কেবলি তোমার জন্য!’

এক নিঃসঙ্গ বোটে- নদীর ঢেউয়ের তালে তালে, চাঁদ আর জোৎস্নাকে সাথে নিয়ে, ছন্দে ছন্দে কাঁপন ধরিয়ে যায় ফেরারি সময়।।
রাত হয়েছে। বাসায় ফিরতে হবে।

রাস্তায় হাঁটছি। আমার মৃত্যতে কারো কোন দুঃখ নেই। দুঃখতো পরের কথা; বিষ্ময়ও নেই। বেঁচে থাকলে মনটা বেশ খারাপ হত। মৃত মানুষের মনই নেই; খারাপ হবে কি। এখন একটা সিগারেট টানতে পারলে মন্দ হত না। বুক ভরে নিতাম নষ্ট নিকোটিনে। একটা টঙের দিকে এগোলাম। সিগারেট কিনব।

দোকানদার সরুচোখে তাকিয়ে আছে। 'আপনে কি মারা গেছেন?'
'হু। কাল রাতে।'
'তাইলে আপনে সিগারেট দিয়া কি করবেন? মারা গেলেতো বিড়ি খাওয়া যায় না।'
'কিছু করব না। ফালাইয়া দিব'
'সিগারেট বেচুম না। মরা মাইনষের কাছে সিগারেট বেচি না।'

বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা।
ওপরে আকাশের দিকে তাকাচ্ছি আর মনে পড়ে যাচ্ছে স্মৃতিময় সব মূহুর্তগুলো।

"চাঁদ মামা আজ বড্ড একা বড় হয়েছি আমি,
রোজ রাতে আর হয়না কথা,
হয়না নেওয়া হামি।

রোজ রাতে আর চাঁদের বুড়ি কাটেনা চরকা রোজ,
ও বুড়ি তুই আছিস কেমন?
হয়না নেয়া খোঁজ!

কোথায় গেল সেই রূপকথার রাত হাজার গল্প শোনা?
রাজার কুমার,কোটালকুমার,পক্ষীরাজ
সে ঘোড়া!
আলাদিন আর জাদুর জিনে আমায় ডাকছে শোনো...
ব্যস্ত আমি ভীষণ রকম সময় তো নেই কোন।

আলিবাবার দরজা খোলা চল্লিশ চোর এলে
সিন্দাবাদটা একলা বসে আছে সাগর তীরে।
সময়টা আজ কেমন যেন বড় হয়ে গেছি আমি
তারা গুলো আজও মেঘের আড়াল কোথায় গিয়ে নামি?

কেড়ে নিলো কে সে আজব সময়
আমার কাজলা দিদি!"

এই মুহূর্তে ভিষণ আপন মনে হচ্ছে 'ওল্ড স্কুলের' কথা গুলো।
হায় আমার শৈশব!
ফেলে আসা লাল গোলাপ।

আমার এই অন্তিম বিষাদ কালে-
চঁন্দ্রিমা,ইন্দুবালা,চঁন্দ্রপ্রভাদের খোঁজই মিলেনি। আর চঁন্দ্রলেখাতো সেই কবেই হারিয়েছে।

চলার পথে রিফাত ভাইয়ের প্রিয়তমার সাথে দেখা। আমাকে দেখা মাত্রই দৌড়ে এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে তাদের নাকি অনেক দিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। 'আপনি কিছু একটা করেন ওরে ছাড়া আমি বাঁচতে চায় না এই পৃথিবীতে। তাইলে মঙ্গলে চলে যাওনা কেন?(মনে মনে বললাম)। এমনিতেই আমার আমি মরে গেছি তার মাঝে উনার আলগা পিরিতি। আমি বিষয়টা খুলে বললাম- আমি মারা গেছি। 'মারা গেছেনতো কি হয়ছে? এই ধরেন এই চিঠিটা শুধু ওর কাছে দিয়ে দিবেন আর কিছু করতে হবেনা আপনাকে' এই বলে চলে গেল। এখন চিঠিটা আমি কি করে পৌছায়? মরে গিয়েও শান্তি নাই এই কাপোত-কাপোতিদের জন্যে। কি আর করার যা আছে কপালে।

বাসার অতি নিকটে এসে অবশেষে দেখা মিলল রকি আর হাবিবের সাথে। চিরচেনা পুকুর পাড় গল্পে মগ্ন তাহারা। আমাকে দেখা মাত্রই তারা আতকে উঠে আর বলে 'শুনলাম তুমি নাকি মারা গেছ? মরা মানুষ হইয়া এতো রাতে বাহিরে কি?'
এই কথা শুনে তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছাটাই মরে গেল। ও আমি নিজেইতো মরা।
অতঃপর মনে পড়ে গেল চিরকোটের 'আহারে জীবন!'

এই চরম বাস্তবিক মুহূর্তে মনে পড়ছে একজন মহা কবি'র মহা কাব্য'কে। যার অন্তরে  সর্বদাই মানবতার প্রবাহমান স্রোত বিদ্যমান। তার নাম বললে বা লিখলে মনের অজান্তেই ভাই নামক ভালবাসার  সূত্রটি চলে আসে। হ্যাঁ তিনি 'জুনায়েদ ইভান ভাই'।

- "আমাদের জীবনে দুটো রেল লাইন আছে। একটা ইমোশন আরেকটি রিয়্যালিটি !

বেশিরভাগ মানুষ যেকোন একটাতে আটকে যায়। হয় খুব বাস্তববাদী হয়; কর্পোরেট ভালোবাসায় নিয়ম করে ঘড়ি ধরে চুমো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ! আর নাহয় চোখের দিকে তাকানোই যায় না-  আবেগে থরথর করে কাঁপতে থাকে।

যে কবিতা পড়ার পর প্রবল আবেগে আপনার মরে যেতে ইচ্ছে করে,  কর্পোরেট লাইফের এই দুনিয়াটাকে অনর্থক নিরর্থক মনে হয় সেই কবিতারও একটা মজবুত রিয়্যালিটি আছে। কবি কিন্তু তার পংক্তিমালা ব্যাগে করে নিয়ে প্রকাশকের সাথে আলাপ করেছেন। যে পংক্তিমালা পাঠ করে আপনি ফ্লোরে চিত হয়ে পড়েছিলেন, সেই পংক্তিমালার আবেগের দামে টেবিলের উপরে রাখা ক্যালকুলেটর দিয়ে কবি তার প্রাপ্য কমিশনের  হিসেব কষেছেন ! বেঁচে থাকার জন্য দুটোরই দরকার আছে।  তানাহলে  ওরা আপনাকে বাঁচতে দেবে না। 

খুব সামাজিক কিংবা খুব অসামাজিক কোনটাই আসলে ভালো না।  কারো চিন্তা চেতনা আমার সাথে মেলে না তাই আমার চিন্তার অংশে আমি কাউকে রাখব না - এসব অনেক মান্ধাতা আমলের ফিলোসফি। কিছু সয়ে যেতে হয়, কিছু আপনাতেই সয়ে যায়। সব কিছু নিয়েই জীবন।

অফিস পাড়ায় রোদে দর কষাকষি আর শ্রাবণের বৃষ্টিতে কাউকে লং রোডে নিয়ে সব বিলিয়ে দেয়া - দুটোই জীবনের সুন্দর অংশ।  বৃষ্টির রাতে লং রোডে ঘুরতে বের হবার পয়সাটা অফিস পাড়ায় রোদে দর কষাকষি থেকেই আসে। দুটোই সুন্দর। দুটোকে আলাদা করে দেখতে গেলেই যত দ্বন্দ্ব।

কোনদিনও নিজের ইমোশনের কাছে হেরে যাবেন না।  যখন এই পৃথিবীটাকে একটা স্বার্থপর গ্রহ মনে হবে; সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে হেরে যেতে ইচ্ছে করবে তখন পা ফেলতে হবে রিয়্যালিটিতে।"
হ্যাঁ আমি এখন দ্বিতীয়টিতে দন্ডায়মান।

সারাদিন বেশ ভাব ধরে ছিলাম। ভাব ধরে ছিলাম- মরে গেছি তাতে কি। কিন্তু তাদের ব্যাপারটায় নতুনকরে উপলব্ধি হল- আমি মারা গেছি। আসলেই মারা গেছি। ভরা পূর্নিমার ফিনকি দিয়ে পড়া জ্যোৎস্না আমি দেখব; কিন্তু জ্যোৎস্নারা আমাকে ছুঁবে না। অকৃতজ্ঞের মতো আমাকে উপেক্ষা করে মাটিতে পড়বে। তারা ভুলে যাবে তাদের জন্য লেখা আমার কবিতার ঋণ। কেউই আমার আপন হইলনা। শুধু আপন হলো অসম্ভব ভয়ংকর লাশকাটা ঘর। আমার আপন নীড়।। 
সমুদ্রে জাহাজ নেই, অতলে ডুবে গেছে ক্যাপ্টেন। এম্বুলেন্স অসুস্থ; লাশের কপালে দুঃখ আছে।

মৃতরা কাঁদে না; কাঁদতে পারে না। চোখ দিয়ে অশ্রু না গড়ালেও যে কেউ দেখলে বুঝত আমি কাঁদছি। একজন মৃত মানুষ কাঁদছে।

প্রয়োজনে:-  01611501136

 

Monday, July 5, 2021

ফজলুর রহমানের লেখা ছোট গল্প নি:শব্দে নির্বাসন



নিঃশব্দে নির্বাসন

                                       ফজলুর রহমান


 

দুটি বোবা নর-নারীর মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেটি গাঁদা ফুলের মালা মেয়েটির গলায় পরিয়ে দিল। মেয়েটিও সজ ভঙ্গিতে কাঁপা কাঁপা হাতে ছেলেটির গলায় ঐ একই ফুলের মালা পরিয়ে দিল। এবার মেয়েটির যা দুই চারজন বান্ধবি ছিল তারা খলবলিয়ে হেসে উঠলো ঠিকই কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় হেরিকেনের টিমটিমে আলোয় সে হাসি চোখ চেয়ে দেখা গেল না। কেবল একটা রোল খানিকক্ষণ গুঞ্জরিত হয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেহেতু কোনো ধনী মানুষের বিয়ের আয়োজন এটা নয় তাই কাঁচা বেলী বা গোলাপের মালার ব্যবস্থা কেন নেই সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তবে গাঁদা ফুলগুলো টাটকা। আজকেই তোলা। ছেলেটির একমাত্র বন্ধু বাদল এক ফুল বিক্রেতার বাড়ি গিয়ে কিনে এনেছে। বিয়েতে কোনো নিয়ন আলো জ্বলেনি, কোনো কোর্মা-পোলাও রান্না হয়নি। কার গাড়িতে চেপে ধুলা উড়িয়ে নানান বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে লটবহর সমেত বরযাত্রা আসেনি। লোক জন যা এসেছে তা হাতের কড়ে আঙুলে গোনা যায়। কনের বাসা একরুম বিশিষ্ট। বাসার সামনে এক চিলতে দাঁড়ানোর জায়গা। সে জায়গাটুকু আবার বাড়িওয়ালার। অপরিসর রুমটির মাঝখানের চৌকিতে বসানো হয়েছে বর ও কনেকে। তাদেরকে ঘিরে অপ্রসস্ত জায়গা জুড়ে বিয়ে বাড়ির চেনা-অচেনা লোক জন। বিদ্যুৎহীন চৈত্রের গুমোট সন্ধ্যায় মানুষের ঘেমো শরীরের একটা কূট গন্ধ হেরিকেনের অবছা অন্ধকারে  ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। থেকে থেকে জন্তু-জানোয়ারের মতো একটা গুতোগুতির শব্দ, অশ্লীল ফিসফাস বাক্যালাপ ও অট্টহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিতান্ত সাদামাটা ঘরোয়া এ আয়োজনে ছেলেটি ভেবেছিল মানুষের ভিড়-ভাট্টা, হৈ-চৈ তেমন হবে না। কথা বলতে না পারা দুটি মানুষের বিয়ে - এতে অন্য মানুষেরা কী আর আগ্রহ দেখাবে ? কিন্তু অপরিসর রুমটিতে জামাই-বউ দেখতে আসা নারী পুরুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে ছেলেটি ভাবলো চিড়িয়াখানার জন্তু দেখতেও এতো ভিড় হয় না। তারা বোবা বলে উপস্থিত উৎসুক জনতা তাদেরকে  সার্কাস দলের নট-নটীদের মতো আপদমস্তক নিরীক্ষণ করে দেখচ্ছে। তাদের চোখে-মুখে কটাক্ষের ভাব। বিয়ের মতো এমন মর্যাদাপূর্ণ কাজ তোমাদের মতো দুটি বোবা মানুষের আবার কেন করার দরকার পড়ল ? এসবে তো আমাদেরই একাট্টা অধিকার। কেউ কেউ মুখ টিপে টিপে বিকৃত হাসি হেসে অন্যের গায়ে ঢলে গড়িয়ে পড়তে পড়তে ফিসফিস করে বলে চললো - ‘আরে বোন ওসব কথা বলো না বোবা বলে কী সখ-আহ্লাদ থাকতে নেই না কী ? রাতে স্বামীর কোলে শুয়ে...’ তারপরের কথাটুকু আর উচ্চারণ যোগ্য নয়।

বিয়ের সব অনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত সাড়ে নটা বেজে গেল। তারপর কালোমতো স্থূলদেহী এক মহিলা এসে মৌচাকে টিল মারা মতো করে বাজখাই গলাই বলল - ‘মাগিগোর কোনো কাম-কাইজ নাই না কি ? বোবা দুইডা মাইনষের বিয়া দেখইন লাইগ্যা ঘণ্টর পর ঘণ্টা খাড়াই রইছে। ঔই সব বড়িত যাওনা ক্যান? এহানে কী মধু ঝইর‌্যা পড়ে ? না রহিম রূপভান যাত্রাপালা চলে ? যাও কইতাছি হারামজাদির দল।’ স্থূলদেহী মহিলার কথায় কাজ হলো। দর্শনার্থীর অধিকাংশ ছিল মহিলা আর উঠতি বয়সী পোলা-মাইয়া। এদের বেশিরভাগ পোশাক শিল্প শ্রমিক। সবাই এক এক করে বিয়েবাড়ি হতে বিদায় নিতে শুরু করলো। মিনিট দশেক হলো বিদুৎ এসেছে। সকলে একে একে বিদায় নিলে স্থূলদেহী মহিলাটির পরিচয় জানা গেল। সে বাড়িওয়ালী। নাম হাজেরা। স্বামী বেঁচে নেই। স্বামী পোশাক কারখানার ইলেকট্রিশিয়ান ছিলেন। বাড়িওয়ালীর আদি নিবাস ঢাকার গাবতলী। যে দুটি নর-নারীর বিয়ে হলো ওরা  পোশাক শ্রমিক। ছেলেটি নাম টগর আর মেয়েটি পারুল। সবাই  ছোটো করে পারু বলে ডাকে। টগর থাকে চট্টগ্রাম বদ্দারহাট। আর পারুর বাসা নাসিরাবাদ। অবশ্য আজ রাত থেকে তার ঠিকানা হবে বদ্দারহাট। আজকে সে এ বাসা ছেড়ে দিচ্ছে। বিয়ের দিন কোনো মেয়ের একেবারে বাসা ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা বিরল। পারুলের কোনো বাবা নেই। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তার কোনো ভাই বোনও নেই। তাদের বাড়ি ছিল ঢাকা সাভারের হেমায়েতপুর বাজার বাসস্ট্যাণ্ডের নিকটে। বাবা ছিল সবজি বিক্রেতা। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বিধবা দাদির সাথে চট্টগামে নাসিরাবাদে একটা বস্তিতে উঠে আজ থেকে দশ বছর আগে। তখন পারুর বয়স ছিল  পনেরো বছর। দাদি গুলনাহার একটা পোশাক কারখানায় ডাইং এর কাজ পেয়ে যায়। অজানা অচেনা শহরে একটা চাকরি ও মাথা গোজার ঠাঁই পেয়ে দুটি অসহায় নারী বেঁচে-বর্তে যায়। এখন গুলনাহারের বয়স হয়েছে। তার বয়স ষাট। গুলনাহার এতোদিন নাতনিকে কিছু করতে না দিলেও গত এক বছর পারু গুলনাহারকে আর কারখানায় যেতে দিচ্ছে না। দাদির পরিবর্তে সে নিজেই গুলনাহার যে কারখানায় কাজ করতো সেখানে জয়েন করেছে। গুলনাহার প্রথমে বাধা দিলে পরে পারুর জিদ আর নিজের বয়সের কাছে সে বাধা পরাজিত হয়েছে। কারখানার মালিক ভালো। আর অনেকদিন ধরে কাজ করায় গুলনাহার তার বোবা নাতনির জন্য মালিককে ধরে বসলে মালিক প্রথমে আমতা আমতা করলে গুলনাহার বলেছিল -

‘পারু বোবা হলে কী হবে স্যার ও ভালো সেলাইয়ের কাজ জানে। আপনি ওকে সুইং এ লাগিয়ে দিন। দেখিয়ে-শিখিয়ে দিলে দেখবেন ও ঠিক পারবে। বিশ্বাস করুন।’

সেই থেকে শুরু পারুর চাকরি জীবন। পনেরো বছরের বোবা পারু এখন পঁচিশ বছরের যুবতী। লুপ্ত রাজবড়ি যেমন কথা না বলতে পারলেও অবয়বে ধরে রাখে নানান সৌন্দর্যের কারুচিহ্ন। আগত দর্শনার্থী এসে সে রূপ দেখে বিভোর হয়। ছুঁয়ে দেখার তৃষ্ণাবোধ করে পারুর রূপও সেই রকম। ও বোবা বলেই ওর শরীরে সে রূপ আরো বেশি ভাষায়িত ও রেখায়িত হয়ে উঠেছে। তাই কথা বলতে না পারায় নিজের প্রতি ওর আগ্রহ কম থাকলেও শুধুমাত্র রূপের কারণে ওর প্রতি অন্যের আগ্রহের কমতি নেই। চাকরি পেয়ে পারুর শুরু হয় নতুন এক জীবন সংগ্রাম। এতোদিন দাদি তাকে খাইয়েছে পরিয়েছে। এখন সে দাদির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। চাকরিতে জয়েন করার দুইমাস পরে নাসিরাবাদে তার কারখানা হতে আধা কি:মি: দূরে আর একটা কারখানায় চাকরি করা টগরের সাথে পরিচয় ঘটে পারুর। টগরের বাড়ি গাজীপুরের চন্দ্রা। ছোটবেলা মা মারা যাওয়ার পরে বাবা তাকে ঢাকায় একটা এতিমখানায় দিয়ে যায়। এরপর বাবা মোসাদ্দেক মোল্লা তার আর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। তার বাবা আর একটি বিয়ে করার কথা সে শুনেছিল আরো বছর খানেক পরে। এরও দশ বছর পরে একদিন তার বাবার মৃত্যু সংবাদ পায় সে। এ দশ বছরে মোসাদ্দেক মোল্লা তাকে একটিবারের জন্য দেখতে আসেনি। প্রকৃতি যাকে বোবা করেছে কথা বলার মানবিক অধিকার থেকে যে বঞ্চিত তার প্রতি পিতৃঋণের দায় থাকে না। সে দাবি নিয়ে টগরও কখনো মোসাদ্দেক মোল্লার কাছে দাঁড়ায়নি। এতিমখানাতেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব তৈরি হয় বাদলের সঙ্গে। বন্ধুত্ব হরিহর আত্মায় রূপ নেয়। বাদলও এতিম। টগরের পিতা মরার খবর যেদিন এলো তখন তারা কিশোর। সেদিন রাতে তারা দুজন এতিমখানা থেকে পালিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে চট্টগ্রাম আসার ট্রেন ধরেছিল। চট্টগ্রাম এসে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় দুজনকে। প্রথমে একটা জুতো তৈরির কারখানায় কাজ জুটে যায় ওদের। সেখানে দুবছর কাজ করে একটা বিস্কুট তৈরির কারখানায় তিন বছর কাজ করে সেটাও ছেড়ে দেয় ওরা। এরপর বাজারে একটা পুরনো কাপড় বিক্রির দোকানে কাজ পায় টগর। আর নাসিরাবাদ একটা পোশাক কারখানায় চাকরি পেয়ে যায় বাদল। এর আগ পর্যন্ত দুইবন্ধু একই সাথে চাকরি করেছে। এই প্রথম দুজনের দু জায়গায় চাকরি জীবন শুরু হয়। দুজন দুজায়গায় চাকরি করলেও দুজনা চলাচলের সুবিধা এবং বাসাভাড়া কমের জন্য বদ্দারহাটে তারা একসঙ্গে এক রুমের একটা বাসা নিয়ে নেয়। সেখানে  থেকেই দুজন রোজ যাওয়া আসা করে। নাসিরাবাদে পোশাক কারখানায় কাজ নেওয়ার তিনবছর পরে বাদল মালিকের কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করে টগরের জন্য তার কারখানায় একটা কাজের ব্যবস্থা করে ফ্যালে। বছর দুই হলো টগর বাদলদের কারখানায় কাটিং সেকশনে জয়েন করেছে। পুরনো কাপড়ের দোকনে কাজ করতে করতে গত তিন বছরে সে কাপড় কাটার কাজটি মালিকের কাছ থেকে ভালো করে রপ্ত করে নিয়েছে। আজ থেকে দশ বছর আগে কমলাপুর রেল স্টেশন ছেড়ে চট্টগ্রাম এসেছিল টগর। তখন সে কিশোর ছিল এখন সে টগবগে যুবক। স্রষ্টা তাকে ভাষাহীন করেছে বটে, কিন্তু তার চোখ দুটি ভাষাদীপ্ত। ঝাঁকড়া চুলের সুঠাম দেহের অধিকারী  শ্যামাঙ্গের অধিকারী  টগর কথা বলতে পারে না - অপরিচিতদের কেউ এমনটা শুনলে প্রথমে অবাক হয়। পরে টগরকে তারা আপদমস্তক নিরীক্ষণ করে এবং তাদের মুখে একটা অস্ফুট আফসোসের ধ্বনি ‘আহা’ শোনা যায়। টগরের সাথে পারুর পরিচয়ের একমাস পরেই বাদলের চেষ্টায় পারু আর টগরের বিয়ে হয়ে গেল। এর দুই মাস আগে বাদল নাসিরাবাদে তাদের কারখানার সিকিউরিটি গার্ড দেলোয়ারের মেয়ে বৃষ্টিকে বিয়ে করে এনেছে। বাদল চুপচাপ স্বাভাবের হলেও বৃষ্টি চপলা, মুখরা। এই দুই মাসে সে দুই বন্ধুর মধ্যে কেমন যেন সাপের মতো কামনার বিষাক্ত নেশাকে জাগিয়ে তুলতে তৎপর হয়ে উঠেছে। ঘর করে সে বাদলের কিন্তু চোখ থাকে তার টগরের দিকে যেনো। টগর যা মুখ ফুটে চাইতে পারে না, যা বলতে পারে না; যেখানে টগরের সীমাহীন দ্বিধা আর সঙ্কোচ সেখানে বৃষ্টির অবাধ অপরিসীম নিঃসঙ্কোচ বিচরণ। বাদলের রং কালোর দিকে। তবে তা ছাতার কাপড়ের মতো কালো নয়। হ্যাংলা-পাতলা গড়ন। বন্ধু অন্তপ্রাণ মানুষটির কাছে বউ বৃষ্টির আচরণ ক্রমশ দুর্বোধ্য ও রহস্যময় বলে মনে হতে শুরু করেছে। পেটের ব্যথার কথা বলে আজকের বিয়ের অনুষ্ঠানে সে যায়নি। বালিশে মুখ গুঁজে বিছানায় সারাদিন উপুর হয়ে শুয়ে ছিল। বাদল টগরকে দোষারূপ করতে চায় না। টগর পুরুষ মানুষ। হোক সে বোবা। নারীর সাবলীল উপস্থিতি ও সহজাত নিবেদনের ভাষা বোবা পুরুষও বোঝে। তার শরীরেও উদগ্র কামনার বীজ ফোটে। চোখে নেশার মধুরস সৃষ্টি হয়। তার সব কিছু থাকতেও তার বউ কথা বলতে পারে না এমন একজন বোবা মানুষের প্রতি ঝুকলো কেন এটি তার কাছে বড়ই রহস্য মনে হয়। নারী মনের কত খাঁজ, কত তার গোপন কুঠুরি। সব কী পড়া যায় ? আর পুরুষের কাছে সব কী ধরা দেয় ? তার বউ বৃষ্টিই আগুনের উত্তাপ নিয়ে টগরের সামনে হাজির হয়। টগর সে আঁচ থেকে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করলেও আগুনের ধর্মই হলো তা অন্যের দিকে ধেয়ে আসা। তাই আগুনের কাছাকাছি থাকলে তার ছোঁয়াচ থেকে বাঁচা কঠিন। যে বন্ধুত্ব ভাঙার নয়, হারাবার নয়, বিপন্ন হবার নয় সে বন্ধুকে সংকটের হাত থেকে রক্ষর জন্য বাদল পারুর মতো একটি মেয়েকে খুঁজছিল এবং সেটি মিলেও গেল।

 

আগে দশ বছর দুই বন্ধু চট্টগ্রাম এসে যে যেখানেই কাজ করুক না কেন এক রুমেই থেকেছে। দুইমাস হলো বাদল আলাদা একটা রুম নিয়েছে। বউকে নিয়ে সে সেখানেই থাকে। বাদলের রুমের পাশের রুমটাতে টগর থাকে। টগর বিয়ে করছে বলে টগরের রুমের সাথে লাগোয়া আরো একটা রুম টগরের নামে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। যেহেতু এখন থেকে টগরের সাথে পারু এবং পারুর দাদি গুলনাহার থাকবে এই তিনজনের জন্য দুটি রুম। এটা বস্তিপাড়া বাসাগুলো টিনের ছাপড়া। দুটি ফ্যামিলির জন্য একটি করে রান্নার ঘর আর একটি করে বাথরুম। আশপাশের অন্য বস্তিগুলোর তুলনায় এই বস্তিপাড়াটির বসবাসের ব্যবস্থা ভালো। পরিবেশটাও অতো নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর নয়। তবে ধনী বা মধ্যবিত্তের মতো অতো স্বাস্থ্যকরও নয়। বস্থির গা ঘেঁসে একটা পাউরুটির কারখানা ও একটি শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা আছে। শুটকির গন্ধে গা গুলিয়ে যায়। শুটকির গন্ধের নিচে পাউরুটির ঘ্রাণ চাপা পড়ে যায়। অসুবিধের মধ্যে এটুকুই যা অসুবিধে। তবে যারা নিয়মিত থাকে তাদের ওসব গা সওয়া হয়ে যায়। আর এখানকার মানুষেরা বেশিরভাগই নানা পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ। সারাদিন তারা বাইরে কাজ করে।  ঘুমানো ও জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য রাতে তারা ঘরে ফেরে। তাদের সন্তানেরাও সারাদিন ঘরের খোঁজ করে না। বাইরে বাইরে টো টো করে ঘোরে। কুসঙ্গে মেশে, নেশায় আসক্ত হয়। একটু মাথা তোলা হলে যে যার রুটি-রুজির পথ খুঁজে নেয়। দিন শেষে সন্তানদের কে বাসায় ফিরলো, কে ফিরলো না এ নিয়ে বাবা মারা বেশি শংঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন থাকে না। তারা ভেবে নেয় আজ না ফিরলে কাল ফিরবে নয়তো পরশু। কোথাও আছে নেশা ভান খেয়ে বন্ধুদের সাথে পড়ে। মরে না গেলে নিশ্চয় ফিরবে। পড়াশোনার ধার তারা ধারে না। এ বস্তির নারী-পুরুষ তাই দৈহিক তাড়নায় ও প্রবৃত্তির নিবারণে মিলিত হয়, নারীর গর্ভে সন্তানও আসে শরীরবৃত্তীয় নিয়মে এবং সে সন্তানের ছন্নছাড়া হয়ে বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটিও সহজাত নিয়ম বলেই এখানকার বাসিন্দারা মনে করে। শুটকির কারখানা থাকায় এখানে বাসা ভাড়া কম। কনেকে বরের বাসায় নেয়ার জন্য কোনো টমটম, কার বা মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা ছিল না। রিকসায় সম্বল। দুটি রিকসা ভাড়া করে চারজন মানুষ চড়ে বসতেই আকাশে মেঘের ডাক শুনতে পেল সবাই। গুলনাহার ও বাদল একটি রিকসায় চড়েছে। অন্যটিতে টগর পারু। রিকসা চলতে শুরু করেছে। নাসিরাবাদ থেকে বদ্দারহাট রিকসা পথ। বাসেও আসা যায়। নতুন বউকে নিয়ে লোকাল বাসে না উঠে টগর রিকসা নিয়েছে। রিকসায় আধা ঘন্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগে। রওয়ানা দিতে দিতে সাড়ে দশটা বেজে গেল। টগর হাত ঘড়িটা দেখে নিলো রাত পৌনে এগারোটা বাজে। চারিদিক দিয়ে একটা হাওয়া বইছে। রিকসায় হুড তোলা। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কমে এসেছে। রাস্তা সুনশান নীরব। মাঝে মাঝে দু একটা সিটি বাস হর্ন বাজিয়ে রিকসার কোল ঘেঁসে চলে যাচ্ছে। হেলপারের কণ্ঠে এই নাসিরাবাদ, চাঁকদা, চকবাজার, স্টেশনরোড ডাক শোনা যাচ্ছে। বাসগুলো যখন তাদের রিকসা ক্রস করছে টগর খেয়াল করলো পারু টগরের বামহাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে। হয়তো সে ভয় পেয়ে এমনটা করছে। টগর পারুর মাথার উপর ডান হাতটা রেখে স্মিত হেসে ইশারা করে বুঝালো ভয় পেয়ো না আমি আছি। ঘোমটার আড়াল থেকে আঁধারেও যেন বিদ্যুৎ রেখার মতো টগরের মনের কথা বুঝে খুশিতে পারুর চিবুক নড়ে উঠলো। রিকসার ভেতরে দুজনার শরীর দুজনার সাথে পাশাপাশি ঠেসে লেগে আছে। দুজনার শরীর থেকে বের হচ্ছে গাঁদা ফুলের ঘ্রাণ। টগরের ঘরের চাবি বৃষ্টির কাছে রেখে গিয়েছিল। ফুলের দোকানে দুটি ছেলেকে বলা ছিল তারা এসে বৃষ্টির কাছ থেকে চাবি নিয়ে টগরের ঘর খুলে বাসরঘর সাজিয়ে দিয়ে গেছে। কোনটি রুমটি বাসর ঘর হবে টগর তা ছেলে দুটিকে আগেই দেখিয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যার পর ঘর সাজিয়ে ছেলে দুটি বৃষ্টিকে চাবি দিয়ে চলে গেছে। সাজানো শেষ হলে ছেলে দুটি বৃষ্টিকে ডেকে ঘরটা  দেখতে বললে বৃষ্টি প্রথমে রাজি না হলেও ছেলে দুটির অনুনয়-বিনয়ে শেষ-মেশ বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে সে যখন টগর আর পারুর বাসর ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল তখন বুকের খুব গভীর থেকে একটা তপ্ত নিঃশ্বাস বের হয়ে এসে তার বুকে তা আছড়ে পড়ে বুকটা যেন পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছিল। বাসর ঘর টগর সাজাতে চাইনি। বাদল টাকা দিয়েছে। বাদল সাজিয়ে দিয়েছে টগরের বাসর ঘর। বলেছে বন্ধুর তরফ থেকে এটা বন্ধুর জন্য উপহার। টগর বন্ধুকে বুঝিয়েছিল বোবা মানুষের আবার বাসর কিসের? বাদল শোনেনি টগরের কথা। তার স্বামীর কেনা গোলাপের ভাঁজে ভাঁজে পারুর ভালোবাসার উপাখ্যান রচিত হবে। টগরের ঝঁকড়া চুলে, সুঠাম দেহে  বোবা পারুর দেহের বুদবুদ জাগবে, ভাষার জোয়ারে ভাসবে না। আর সেখানে সেতারের মতোন দেহ সৈষ্ঠবে বৃষ্টি চাইলেই ছিপছিপে ডিঙি নৌকা হয়ে টগরের দেহে ভাবে ও ভাষায় কাম ও প্রেমের বান ডেকে আনতে পারতো। সাড়ে এগারোটায় যখন বর-কনে সমেত বাদল বাসায় পৌঁছালো ততক্ষণে বৃষ্টির চোখ নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে এসেছে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে সে জেগে উঠে বসলো। জেগে থাকতে থাকতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ দুটি তার ভীষণ জ্বালা করছে। পাতা দুটিও ফোলা এবং ভারী। বেশ খানিকটা সময় কেঁদেছেও সে। এ কান্নার কোনো ব্যাখ্যা নেই। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে চোখ দুটি কচলে নিল সে। কাক ঘুম এসেছিল সে। চোখ জ্বালা করার পাশাপাশি বুকটাও কেন যেন জ্বলতে শুরু করলো তার। আলাদা কোনো শাড়ি সে পরেনি। সাজগোছও সে করেনি। যাওয়ার সময় বাদল তাকে একটু সাজগোছ করতে বলেছিল। কানটা খাড়া করলো সে। আর একবার দরজার কড়া নড়ার শব্দ শুনলো। তারপর টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেল সে। বুকের স্খলিত কাপড়টা টেনে বিছানা থেকে নেমে দরজার শেকল খুলেই সে টগর ও পারুকে দেখতে পেল। কোনো প্রেমিক দীর্ঘদিন প্রেম করে প্রেমিকাকে না বলে কয়ে অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করে সদ্য বিবাহিতা বউকে প্রেমিকার সামনে হাজির করলে প্রেমিকার মুখের ভাবান্তর যেমনটি হয়, বৃষ্টির চেহারাটাও এই মহূর্তে তেমনটি দেখলো। কোনো নারীর বিধবা হওয়ার সংবাদ নিশ্চিত হলেও চেহারাটা এতোটা ম্লান ও ফ্যাকাশে দেখায় না। দুটি বোবা ভাষাহীন মানুষের বাসর রাতে ভাষার আবেদন নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। যে মনোযন্ত্রণা নিয়ে বৃষ্টির আজ সারাদিন কেটেছে। তার খবর কে রেখেছে ? আহত পাখির মতো তার মনের ছটফটানি তো কেউ দেখেনি। যাকে পাবে না জানলেও সান্নিধ্যটুকু পাওয়া যাবে এতদিন এ নিশ্চয়তাটুকু ছিল। আজ সে সান্নিধ্য পাওয়ার সুখটুকুও খোয়া গেল। আজ সে চিরদিনের মতো পারুর হয়ে গেল। টগরের সাথে তার সম্পর্ক দেবর-ভাবির হলেও বিয়ের আগে টগরের পুরুষ হৃদয়কে সে তার নারী মন দিয়ে একাকী অধিকার-অনধিকারের মাধ্যমে অনেকখানি দখল করে রেখেছিল। অলিখিত সে অধিকারের মধ্যে টগরও খানিকটা বাধা পড়েছিল। নারী সঙ্গহীন বোবা পুরুষ বন্ধুর স্ত্রী জেনেও বৃষ্টির সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে যেতে পারেনি। পারু আসার আগে সেখানে ছিল বৃষ্টির একক কর্তৃত্ব ও দখলদারিত্ব। আজ সে দখলস্বত্ব  কড়াই-গণ্ডায় বুঝে নেবে পারু।  বোবা বলে তার এক কানা কড়িও ছাড় দেবে না। বুকের যে জ্বালায় সারাদিন জ্বলছিল বৃষ্টি তাতে ঘি ঢেলে তেজ আরো উসকে দিয়ে সে জ্বালা দ্বিগুণ করে তাকে বধূবরণ করতে হলো না। ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টি তাকে সে যন্ত্রণা থেকে রক্ষে করলো। কোনো রকমে পরিচয় পর্বটুকু সেরে যে যার মতো দৌড়ে ঘরে উঠে গেল।

 

দুটি বোবা মানুষের বাসর এর চেয়ে আর কী আড়ম্বরতায় হতে পারে ? বাদলের সৌজন্যে সাধারণ একটা চৌকি  গোলাপ ও রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হয়েছে। পায়ের কাছে জানালাটা বন্ধ রাখা হয়েছে যেন শুটকি কারখানার আঁশটে গন্ধ ভেতরে না ঢুকে পড়ে। তবুও বৃষ্টি ও বাতাসের ঝাপটার সঙ্গে সে গন্ধ গোলাপ ও রজনীগন্ধার সাথে মিশে হলেও দুজনার নাকে এসে খানিকটা ধাক্কা খেল। পারু গন্ধটায় নাক কুচকে টগরের দিকে তাকাতেই টগর বিষয়টি বুঝতে পেরে পারুকে ইশারায় সবটা বুঝিয়ে বলল। গুলনাহার তার ঘরে ঢুকে গেছেন। রাতের খাবার তারা সাথে করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কারো  কোনো খাবার ইচ্ছে নেই। গুলনাহার পোশাক বদলে এসে তাদের সাথে দেখা করে বলে গেলেন। তখন রাত প্রায় পৌনে একটা বাজে। তিনি ঘুমোতে যাচ্ছেন। তিনি কিছু খাবেন না। পারু ও টগরকেও ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। বললেন বাইরে বষ্টি হচ্ছে ওদের যদি কোনো কিছু দরকার হয় তবে ওরা যেন তাকে ডাক দেন। কথাগুলো গুলনাহার বলে চলে গেলেন। পারু ও টগর চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল এতক্ষণ। পারু ঘোমটা সরিয়ে ইশারায় টগরকে উঠে দাঁড়াতে বলল। টগর উঠে দাঁড়ালে পারু টগরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে দাঁড়ালে টগর ডানহাত দিয়ে পারুর থুতনিটা উঁচু করে ধরতেই দেখলো পরম আবেশে পারুর চোখ দুটি বোজা। ঠোঁট দুটি ঈষৎ কাঁপছে। এই মুহূর্তে বুকটাও কী দুরু দুুরু করছে পারুর ? পারুকে বুকে জড়িয়ে ধরলো টগর। দুটি বোবা মানুষের জীবনে এর চেয়ে আনন্দের ক্ষণ আর কী হতে পাওে ? সারা বিশ্ব না জানুক এই বৃষ্টি ভেজা রাত আর পারুর খোপার গাঁদা আর ঘরের গোলাপ, রজনীগন্ধরা জানুক আজ ওদের বাসর। কিন্তু জীবন তো এমন নিরবিচ্ছিন্ন সুখের আধার নয়। বিয়ের পর আবার যে যার মতো কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। কেবল ব্যস্ততা নেই বৃষ্টির। গুলনাহার বয়স্ক মহিলা হলেও সে নিজে বাজার করে। টগর ও পারুর জন্য রান্না-বান্না করে। সাংসারিক কাজকর্ম করে তার দিন কেটে যায়। মাঝে-মধ্যে বৃষ্টিকে ডেকে নিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে গল্প-গুজব করে। তবে সে গল্প-গুজবে বৃষ্টির ভেতরে সাড়া থাকে না। তার মন অন্য কোথাও পড়ে থাকে। রাতে তার স্বামী বাদল, টগর আর পারু বেশিরভাগ দিন একসাথে ফেরে। কখনো কখনো আলাদা ফেরে। তবে টগর ও পারু সব সময় একসাথে আসে। যত রাতই হোক টগরকে এক নজর না দেখলে তার ভোলো লাগে না। সে জানে এটা পাপ। কিন্তু এ পাপ থেকে সরে আসার উপায়ও তার জানা নেই। বিয়ের দুই মাস যেতেই বৃষ্টির ব্যাপারটা বোবা হলেও পারু বুঝে ফেলছে। সে বিষয়টি টগরকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে এবং এ বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া বাসনার কথাও টগরকে জানিয়েছে। টগর বাদলের বন্ধুত্বের কথা বলে পারুকে বলেছে আর দুই-এক মাস সবুর করতে। এর মধ্যে বৃষ্টির আচরণ ঠিক না হলে তারা বাসা পরিবর্তন করবে। তবে বৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। এখন সে টগরের দিকে কেবল হ্যাংলার মতো চেয়ে থাকে। কথা-বার্তা কম বলে। বাদল এ নিয়ে বৃষ্টির সাথে অনেক কথা কাটাকাটি পর্যন্ত করেছে। তবে ইদানিং বৃষ্টির আচরণ দেখে বাদল মনে মনে ভেবেছে বোধহয় বৃষ্টি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। বৃষ্টি বোধ হয় ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু বাদলের একথা জানা নেই পরকীয়া প্রেমের ঘুণ একবার যারে ধরে তাকে তা কেটে কেটে নিঃস্ব না করা পর্যন্ত ছাড়ে না। তাই বৃষ্টিও ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হতে শুরু করেছে। টগর ও পারুর বিয়ের দুইমাস পরে একদিন টগরের ভীষণ জ্বর এলো। পারু অসুস্থ টগরকে দাদি গুলনাহারের কাছে রেখে কারখানায় গেল ডিউটিতে। বাদলও সকালবেলা বন্ধুর কাপলে হাত দিয়ে দেখে বলল তোর গা ভালোই গরম। তোর আজ কারখানায় গিয়ে কাজ নেই। আমি ম্যানেজারকে তোর জ্বরের কথা জানিয়ে দেব। বৃষ্টি ও দাদি থাকবে তোর দেখাশোনা করবে। ঘরে কোনো বাজার-সদায় না থাকায় গুলনাহার বৃষ্টিকে টগরের কাছে রেখে বেলা বারোটার দিকে বাজারে গেলে বৃষ্টির এতোদিনের টগরকে ঘিরে অবদমিত কামনা যেন জনমানব শূন্য ঘরটায় বাধ-ভেঙে গেল। গুলনাহার চলে যেতেই সে টগরের জ্বরতপ্ত কপালটা আচমকা চম্বুনে চম্বুনে ভরিয়ে দিতে লাগলো। টগর গোঙরানির মতো একটা শব্দ করে বৃষ্টিকে জ্বরতপ্ত দুর্বল দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলো কিন্তু বৃষ্টি চিনে জোকের মতো সবলে শায়িত টগরকে দুবাহু ডোরে জড়িয়ে ধরে টগরের বুকে মুখ গুঁজে বলতে লাগলো তুমি এতো পাষাণ কেন? আমার কষ্ট তুমি বোঝ না ? আমার জ্বর তো তোমার বিয়ের দিন থেকে। আমার অন্তর পুড়ে খাক হয় তুমি দ্যাখো না। তোমার বন্ধু আমারে মারে-কাটে। তারপরেও তো আমি তোমারে ভালোবাসি। তুমি কথা কও তুমি আমারে ভালোবাসো না। ওই বোবা মাগী তোমারে কিচ্ছু দিতে পারবো না। আমি তোমারে ভাষা দিব। আশা দিব। সাহস দিব। বল দিব। ভালোবাসা দিব। আমি তোমার বোবা মুখে কথা হবো। চলো এখান থেকে আমরা দুজন পালায়ে যায়।

 

টগর গোঙরানি দিয়েই চলেছে। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। সে বৃষ্টির বাহুডোর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। তার কপলে ঘাম জমেছে। তবুও বৃষ্টি তাকে ছাড়ছে না। হঠাৎ একটা আলাদা গোঙরানির শব্দ শুনে দুজনার চোখ গেল ভেড়ানো দরজার দিকে। দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল না। ভেড়ানো ছিল মাত্র। দরজা খুলে পারু বিছানায় দুজনকে এমন অবস্থায় দেখে ক্ষিপ্র চিতার মতো বৃষ্টির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে বৃষ্টির চুলের মুঠি ধরে ফেললো। চুলাচুলি কাণ্ড যখন শুরু হয়ে গেছে তখন বাজার নিয়ে ঢুকলো গুলনাহার। গুলনাহার বিষয়টা কিছুটা আচ করতে পেরে তখনকার মতো দুজনকে নিরস্ত করলো। টগর অসুস্থ থাকায় পারু ম্যানেজারকে বলে আগে চলে এসে যা দেখেছে তার বর্ণনা ইশারায় দাদিকে বোঝাতে গুলনাহার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললো - ‘ছি বউমা তোমাকে তো আমি ভালো বলে জানতাম। সেই তুমি এমন করতে পারলে। আজ রাতে বাদল আসুক এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।’ বৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরে গেল।

 

রাতে বাদল ফিরলে ঘটনা জেনে সে ভীষণ লজ্জিত হলো। টগরের জ্বর এখনো আছে। বন্ধুর জন্য তার কষ্ট হলো। বৃষ্টির জন্য তার করুণা হলো। বৃষ্টিকে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দেওয়ার পর মনে মনে ভাবলো আগামীকাল সকালে সে তার বউকে বাপের বাড়ি দিয়ে আসবে। গুলনাহার সাফ জানিয়ে দিয়েছে টগরের জ্বর ভালো হলে তারা এ বাসা ছেড়ে সামনে মাসে অন্যত্র কোথায় বাসা দেখে উঠে যাবে। তবে বন্ধুত্ব তাদের থাকবে। পাশাপাশি বসবাস করবে না এই যা। রাতে বৃষ্টি কোন কিছু খেল না। বাদলের সাথে কথাও বললো না। শুয়ে পড়লো চুপচাপ। বাদল ভাবলো বউকে গায়ে হাত তোলায় রাগ করেছে তাই কথা বলছে না। রাগ পড়লে কথা বলবে ঠিক। তবে অন্য দিনের মতো মারধোরের পরে আজ বৃষ্টি কান্না-কাটি করেনি। কেবল নিরব চোখে বাদলের দিকে চেয়ে ছিল কিছুক্ষণ। রাতে সে চুপচাপ বাদলের পাশে শুয়ে পড়লো।

 

সকালবেলা বাদলের চিৎকারে বস্তির সবার ঘুম ভাঙলো। ঘটনা হলো এই বৃষ্টি শাড়ি পেচিয়ে ফ্যানের সিলিংয়ের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়েছে। ঘরের ভেতরে শূন্যে ঝুলছে বৃষ্টির নিথর দেহটি। মৃত মুখে নেই কারো ওপর কোন রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা। বস্তিবাসী কেউ বুঝতে পারলো না কেন এই আত্মহত্যা? কেবল চারজন ব্যক্তি জানলো এই মৃত্যুর কারণ। একটু বেলা হলে পুলিশ এলো। ডেডবডি নামানো হলো। ময়না তদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হলো মর্গে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাদলকে পুলিশ হেফাজতে থানায় নেওয়া হলো। টগর ও পারু বোবা জেনেও পুলিশ টগর, পারু ও তাদের দাদি গুলনাহারকে বাসা থেকে কোথাও না যাওয়ার নির্দেশ দিল। প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে থানায় ডাকা হবে বলে জানানো হলো। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করলো এটা একটা পরকীয়া প্রেম ঘটিত আত্মহত্যা। কিন্তু তারা বুঝতে পারলো না এই প্রেম কী একতরফা শুধু মেয়েটির দিক থেকে ছিল নাকি বোবা ছেলেটিরও কোনো ধরনের মানসিক সাড়া ছিল ?