Friday, February 25, 2022

ভাষা আন্দোলনের সে সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা । (সংক্ষেপে)

ভাষা আন্দোলনের সে সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা । (সংক্ষেপে) 


নাছরিন আক্তার

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ‘বাংলা’ নাকি ‘উর্দু’—কী হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিষয়টি পূর্ব বাংলার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত প্রশ্নে রূপ নেয়। তখনকার সংবাদপত্রে এই বিতর্কের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সংবাদপত্রগুলো পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সংবাদ প্রকাশ করে ভাষার ইস্যুটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। 


এ সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুসলিম লীগ-সমর্থক পত্রিকাগুলোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রসঙ্গে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়। বাংলা ভাষার পক্ষে তখন প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে দৈনিক ইত্তেহাদ। দৈনিক আজাদও বাংলা ভাষার সমর্থনে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপায়।

প্রথম থেকেই মর্নিং নিউজ বাংলা ভাষার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে পত্রিকাটিতে অব্যাহতভাবে। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও খবর প্রকাশিত হতো। ১৯৪৭ সালে ১৭ ডিসেম্বর মর্নিং নিউজের সম্পাদকীয় কলামে উর্দু-সমর্থকদের একটি তাত্ত্বিক বক্তব্য প্রকাশিত হয়।


পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের একচোখা নীতির বিষয়ে তমদ্দুন মজলিসের কয়েকজন নেতা তৎকালীন মন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। মন্ত্রী এসব বিষয়কে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে দায় এড়ান। তাঁর এই বক্তব্যের ওপর ইত্তেহাদ ‘ভুলের পুনরাবৃত্তি’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।


১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার দাবি তোলেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি অমৃত বাজার পত্রিকা এই খবর প্রকাশ করে।


১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দিন বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে। তাঁর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সম্পাদকীয়র বক্তব্য বাংলা ভাষার পক্ষে পত্রিকাটির জোরালো সমর্থন নির্দেশ করে। কিন্তু একই বছর মার্চ মাসে ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রিকাটি সর্বতোভাবে উর্দুকেই সমর্থন করে।


কয়েকটি পত্রিকা সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দিতে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদে ‘ইনসাফ’, ‘জিন্দেগী’ ও ‘দেশের দাবী’ পত্রিকা থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়।


১৯৫১ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস উপলক্ষে সংগ্রাম পরিষদের পুরোনো কমিটি পুনর্গঠন করে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ৩০ দিনের জন্য শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। 


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালেই ছাত্রছাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।  একপর্যায়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা আসে। স্লোগান ওঠে, ‘১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন একদল ছাত্রছাত্রী। এরপর দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। বিকেলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ছাত্রজনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট পুলিশ। শহীদ হন সালাম-বরকত-রফিকসহ নাম না-জানা অনেকেই।


২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনার পর ভাষার প্রশ্নে আগের রহস্যের জাল ছিন্ন করে দৈনিক আজাদ। এদিন সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করে বিশেষ টেলিগ্রাম। ব্যানার হেডলাইন করা হয়, ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। মুসলিম লীগ সরকার দৈনিক আজাদের এই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরবর্তী কয়েক দিন দৈনিক আজাদ প্রচুর সংবাদ ছাপে। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা নেয়।


মর্নিং নিউজ ছিল উর্দু ভাষার সমর্থক। পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উগ্র প্রচারণা চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকেও তারা বিকৃত করে ২২ ফেব্রুয়ারি খবর প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে অবস্থিত মর্নিং নিউজের প্রেস ও অফিস জ্বালিয়ে দেয়। 


সংবাদে কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিকই ছিলেন বাংলা ভাষার সমর্থক। কিন্তু মালিকানার কারণে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির খবরও পত্রিকাটি খুব কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ জনতা রথখোলা মোড়ে সংবাদ অফিসে হামলা চালায়। ভাষা আন্দোলনবিরোধী ভূমিকার জন্য পত্রিকাটি থেকে তরুণ সাংবাদিক মুস্তফা নূরউল ইসলাম ও ফজলে লোহানী পদত্যাগ করেন।

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন খবর পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতো। এ কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবজারভারের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সম্পাদক আবদুস সালাম ও মালিক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।


সাপ্তাহিক সৈনিক ২১ ফেব্রুয়ারি বের করে বিশেষ সংখ্যা। পত্রিকাটি লাল কালিতে ব্যানার করে, ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ’। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ সৈনিক অফিস ঘেরাও করে। সম্পাদক আবদুল গফুর ও প্রকাশক প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়।


ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক ইনসাফ ও দৈনিক আমার দেশ। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় দৈনিক মিল্লাত ব্যানার শিরোনাম করে: ‘রাতের আঁধারে এত লাশ যায় কোথায়?’। ঘটনার পর মিল্লাত সম্পাদক মো. মোদাব্বেরের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ভাষা আন্দোলনে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকও জোরালো ভূমিকা পলন করে।

Tuesday, February 22, 2022

কবি রকিবুল হাসানের লেখা কবিতা "শেকড়ের ছবি"

শেকড়ের ছবি




রকিবুল হাসান

তোমার সুখের প্রত্যেকটি চাবুকের ঘা এসে আমার বুকে লাগে

আমি হাসি;

নরম মাটির মতো পেতে দিই নিজেকে- তোমাকে ভালোবাসি।


কবিতায় অবজ্ঞা ও অবহেলা সযত্নে বাঁধাই করে রাখি

শব্দ খুলে খুলে তোমাকে দেখি;

নির্ঘুম জীবন ক্যানভাসে তোমার ছবিই আঁকি।


তোমার উপেক্ষা কখনো আমাকে করেনি উজান ঢেউ

একটুও জমিন নেই-নি:স্ব আমি;

শুধু বুকটুকু আছে-তার সবটুকু সুবাসিত ঘ্রাণ তুমি। 


ভালোবাসার আদরে দারুণ কৌশলে যতবার দাও 

বিষের পেয়ালা;

গহিন তৃষ্ণায় পান করি আশ্চর্য সমুদ্রসুখ জীবনবেলা।


কতোটা ভালোবাসলে ভালোবাসা হয়-অংকটা জানিনি 

শেকড়টা ধরে রাখি;

শেকড়ই যে বুকে-পিঁঠে শৈল্পিক ছবি অবজ্ঞা ও অপমানের।


মিরপুর, ঢাকা

আট. দুই. বাইশ

Sunday, February 20, 2022

ফারহানা হৃদয়িনী'র লেখা কবিতা বাংলায় ডাকি মা



 *বাংলায় ডাকি মা*



           ফারহানা হৃদয়িনী 


আমি বাংলায় ডাকি মা,

বাংলা মায়ের মধুর ভাষার হয় কি তুলনা?

এই ভাষাকে কাড়তে চেয়েছিল পাকিস্থানী হায়েনা,

ওরা বোঝেনি বাঙালী অন্যায় মানেনা।

অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিতে, বাঙালীর নাই কোন তুলনা।

ঊনিশশো বায়ান্নো সালের একুশের সেই রক্তঝরা দিনে,

প্রকৃতিতে ছিলো ফাগুন, আর কন্ঠে ঝরেছে আগুন।

স্বাধীকারের দাবীতে রাজপথে নেমেছিলো ছাত্র জনতা মিলে,

বাংলাভাষার দাবীতে রাজপথের মিছিলে।

রাষ্ট্র ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা; বাংলা চাই, বাংলা চাই,

মুখের ভাষা না পেলে যে, আজ ঘরে ফেরার উপায় নাই।

রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, সালাম,

আরো নাম না জানা কত দেশ প্রেমিকের নাম।

বাংলা ভাষার জন্য যারা দিয়ে গেছে প্রাণ,

তাদের রক্তে অর্জিত বাঙালীর সম্মান।

সারা বিশ্বে বাঙালীর জয়গান,

এতো সেই ভাষা শহীদদের অবদান।

স্মৃতির মিনারে শহীদদের স্মৃতি রবে চির অম্লান,

আমরা বাঙালী  দিয়ে যাব চিরকাল তাদের মান।

Friday, February 11, 2022

বঙ্গবন্ধু উপাধি (ফারহানা হৃদয়িনী)

 বঙ্গবন্ধু উপাধি 

📝ফারহানা হৃদয়িনী




ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্বর্ণখচিত নাম, ইতিহাসের এক আলোকিত মহামানব  শেখ মুজিবুর রহমান। যে নামটি বাঙালীর হৃদয়ে, বাঙালীর রক্তে, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা হয়ে মিশে গেছে। বিশ্বের ইতিহাসে যার সাহস ও বীরত্বের গাঁথা চিরকাল অমলীন হয়ে থাকবে।

 বাঙালী জাতির ইতিহাসে আশীর্বাদের দিন ছিলো ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী। যেদিন শেখ মুজিবুর রহমান  ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ করেন

''১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি পল্টনে তাঁকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেয়ার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয় জনগণের কত কাছাকাছি তিনি চলে এসেছেন। এটা ছিলো একটি রাজনৈতিক পালাবদলের নমুনা। কারণ এই বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়ার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠলেন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৬৮ সালের ছাত্রসংসদের নির্বাচনী প্রচার উপলক্ষ্যে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নভেম্বর মাসে চার পাতার একটা প্রচারপত্র প্রকাশ করে। এর নাম ছিল ‘প্রতিধ্বনি’, সম্পাদক আমিনুর রহমান। শেষের পাতায় দুটো লেখা ছিল, দুই কলামে। প্রথম কলামে ছিল ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি। শিরোনাম ছিল ‘কর্মমুখর অতীতের স্বাক্ষর’। এতে বিগত ছাত্রসংসদের কর্মকাণ্ডের একটা ফিরিস্তি ছিল। দ্বিতীয় কলামে ছিল ছয় দফা কর্মসূচির বর্ণনা।

ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগ প্রকাশিত বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’র শেষ পৃষ্ঠায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের প্রথম ব্যবহার হয়। এর শিরোনাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত পূর্ব বাংলার ‘মুক্তি সনদ’ ছয় দফা। ‘বঙ্গবন্ধু’ দুই শব্দের আলাদা করে ছাপা হয়েছিল। শেখ মুজিবের জন্য এই উপাধির আবিষ্কর্তা ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা এবং ওই সময়ে ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক মুশতাক। তাঁর চিন্তা ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো একটা জুতসই কিছু শেখ মুজিবের জন্য খুঁজে বের করা। এই ভাবনা থেকেই বঙ্গবন্ধু শব্দের উৎপত্তি। বিষয়টি একসময় সিরাজুল আলম খানের কানে যায়। তিনি এটা ‘অনুমোদন’ করেন।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ আনে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন রাজনৈতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং গুটিকয় সাধারণ সৈনিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এই মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। ৩৫ জন আসামির সবাইকে পাকিস্তানি সরকার গ্রেফতার করে।

মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা টের পেয়ে বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং স্বৈরাচারী আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে। ছাত্র-জনতার মিছিলে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। গণআন্দোলনে নতিস্বীকার করে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্ত সব আসামিকে মুক্তি প্রদানের ঘোষণা দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয় এবং ওই সভায় তৎকালীন ডাকসুর সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলার জনগণের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান নাম ছাপিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

রাজনীতিতে শেখ মুজিবের একচেটিয়া ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার পথে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এটা পরবর্তী সময়ে তাঁর নামের অপরিহার্য অংশ হয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ  তিনি জাতির জনক উপাধি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জাতির জনক' উপধি দেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব /সংগঠক এবং তৎকালীন ডাকসু ভিপি জনাব আ.স.ম. আব্দুর রব। 

শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ নির্দেশনা দিয়েছিল।

"...মনে রাখবা- রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।" ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেস কোর্স ময়দানের এক জনসভায় এই বজ্রঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।

  শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার এবং মা সায়েরা খাতুন।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তাঁর সাত বছর বয়সে।

খুবই অল্প বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন সম্পর্কে আত্মীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে।

নয় বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে এবং পরে ম্যাট্রিক পাশ করেন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে।

গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৯ সালে স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কাশ্মিরী বংশোদ্ভুত বাঙালি মুসলিম নেতা মি.সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীকালে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রাভাবিত করেছিলেন।

উনিশশ' ৪২ সালে এট্রান্স পাশ করার পর শেখ মুজিব ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে যেটির বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। এই কলেজ থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন।

তবে স্কুল জীবন থেকেই তিনি তাঁর নেতৃত্ব দেবার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। 

তিনি ১৯৪৩ সালে যোগ দেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে এবং ১৯৪৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সম্মেলনে যোগদানের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন।



Monday, January 24, 2022

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১

 বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা


বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখার জন্য এবার মোট ১১ টি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার পাচ্ছেন মোট ১৫ জন সাহিত্যিক। 

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার কমিটি ২০২১-এর সদস্যদের সম্মতিতে এবং বাংলা একাডেমি নির্বাহী পরিষদের অনুমোদনে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সচিব এইচ এম লোকমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকদের নাম ঘোষণা করা হয়। 






 এবার যারা বাংলাএকাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন:

★কথাসাহিত্যে ঝর্ণা রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, 

★প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দীন হোসেন, 

★কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, 

★অনুবাদে আমিনুর রহমান ও রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী,

★শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশিদ, 

★মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, 

★নাটকে সাধনা আহমেদ, 

★বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় হারুন-অর-রশিদ, 

★আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনিতে সুফিয়া খাতুন ও হায়দার আকবর খান রনো, 

★বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞান/পরিবেশবিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী 

★ফোকলোরে আমিনুর রহমান সুলতান। 



প্রাবন্ধিক হোসেন উদ্দীন হোসেন

কবি আসাদ মান্নান

কথা সাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান

কবি বিমল গুহ

৷ 
শিশু সাহিত্যিক রফিকুর রশিদ

কথা সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী 

ফোকলোর আমিনুর রহমান সুলতান

অধ্যাপক পান্না কায়সার

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী 

সাধনা আহমেদ



১৯৬০ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩ লাখ টাকা। এছাড়াও পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননা পত্র ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। 

বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার দেবেন। 

Saturday, January 8, 2022

বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার নতুন কমিটি গঠন ও পরিচিতি সভা

বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার নতুন কমিটি গঠন ও পরিচিতি সভা। 



৭ ই  জানুয়ারী,২০২২, রোজ শুক্রবার, পুরাতন পাবলিক লাইব্রেরী,রোটারী গ্যালারী হলরুম, কুষ্টিয়াতে  অত্যান্ত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে আয়োজিত হলো বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার নব গঠিত পরিষদের পরিচিতি সভা। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল হক আলো (সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি)। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাক্ষ আবু সাঈদ চৌধুরী (সাংগঠনিক সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি), সভাপতিত্ব করেন মোঃ মোফাজ্জেল হক( সভাপতি কুষ্টিয়া জেলা শাখা) । এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের গণ্যমাণ্য সদস্য গণ। সকলের বক্তব্য শেষে মধ্যাহ্ন ভোজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।











কবি কথন/ ফারহানা হৃদয়িনী

 


কবি কথন

কবি যখন কবি তখন সে সাধারণ কেউ নয়,  কবি হওয়া সহজ নয়,  যে অন্য হৃদয়ের দুঃখ ব্যথা আপন অন্তরে ধারণ করতে পারে সেই তো কবি, যে হৃদয়ের বাগানে কথার ফুল ফোটায় সেই তো কবি। কবি হৃদয় কারো একার নয়,  কবি সার্বজনীন কবির ভাষায় ফুটে ওঠে মানবতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবি জ্বালায় দ্রোহের আগুণ। কবি যা লিখতে পারে সকলেই তা লিখতে পারেনা, কবি যে ব্যথা অনুধাবন করতে পারে সকলেই তা পারেনা। কবি যে প্রেমে উন্মত্ত হতে পারে সেটা সকলেই পারেনা। কবি জনতার মনের প্রতিচ্ছবি অংকন করে তার চেতনায় তার বিবেকে তার হৃদয়ের অণু পরমাণুতে। কবি গেঁথে চলে শব্দের স্বপ্নীল মালা। কবি ধণে নয় তার ভাষার গুণে ধণী হয়ে ওঠে, কবি ধনবান তার রচনায়। কবি মৃত্যুর পরেও বাস করে কারো কারো হৃদয়ে।  তাই কবিকে সাধারণ হলে মানায় না। কবি সব সময় অসাধারণ অভিব্যাক্তি নিয়ে পথ চলে তাই, সে হাজারের মাঝেও অসাধারণ রুপে ফুটে থাকে।

                                         ★ ফারহানা হৃদয়িনী ★

Tuesday, December 14, 2021

কবি নূর হেলেনের লেখা কবিতা "বকুল ফুল"




 






"বকুল ফুল"

লেখাঃ নূর হেলেন

মাঝি,

আমার কথা মনে নাই তোমার?

সেই যে মাঘের চান্নিপশর রাইত?

মাথার খোঁপাখান খুইল্যা কইছিলা,

বউরে,

তোরে খোলা চুলে পরীর লাহান দেখায়।

যেন আসমান থাইক্যা অহনি নাইম্যা আইলি।


তয় অহন আমি আর পাট কইরা চুল বান্ধিনা।

চিরুনির দাঁতে ছাত্রা পইড়্যা রইছে।

সুগন্ধি তেল শ্যাষবার কবে মাখছি,

মনে নাই।


তোমার লাহান তো কেউ ডাইক্যা কয় না,

আয়, বকুল, তোর চুলে বিলি কাইট্যা দেই।

লাল ফিতা দিয়া পাঁকায়া দেই মালা বেণি।


পা দুইখান কোলের পরে রাইখ্যা কেউ তো কয়না,

আলতার শিশি শ্যাষ?

কাল হাটের থন ঠিক আইন্যা দিমু।


লোহার ছেকলের কালসিটে দাগ,

আমার আলতার নিশান ধুইয়া দিয়া গ্যাছে।

চিল শকুন আইসা আঁচড় কাঁটছে কোমরে ভাঁজে।


থুতনির সেই ছোট তিল,

যেইখানে ঠোঁট ছোঁয়াইয়া তুমি কইতা,

এইখানে আমার মন রাখছি কইলাম,

তুই সামলায়া রাহিস।


আমি, আমি তারে পারিনাই সামলাইতে।

কালা রক্তের ছোপে ডুইব্বা গ্যাছে তোমার মন।


তোমার বকুল এই উচ্ছিষ্ট শরীরডা লয়া দাঁড়ায়া এহনো।

ঘর নাই, গেরস্থি নাই, পাতে নাই এক নলা ভাত।

পথ চাইয়া থাকতে থাকতে দুই চউক্ষে ছানি পইড়া গেছে।


বয়স মুইছ্যা দিয়া গ্যাছে রূপের বহর!


যুদ্ধ শ্যাষে গবাদি লইয়া,

ঘরছাড়ারাও ঘরে ফিরছে।

নয়া সওদাগরেরা নোঙর ফালাইছে ঘাটে।


খালি আমার অন্তরের আগলখান টানা।

তুমি ছাড়া কাউরে দেইনাই সেই সোনার চাবি।

তুমি তো আর ফিইরা আইলানা মাঝি,

নাও ভীড়াইলানা এই উজানডাঙায়।


কলিজায় লাঙল টাইনা আবাদ করছি এই দ্যাশ,

আঁচল খোয়াইয়া পতাকা জরাইছি গতরে।

ওরা তাই নাম দিছে,

বীরাঙ্গনা!

কওতো কেমুন হইছে নামখান?


তবুও আমার মনের হাউস মেটেনা।

তোমার লাহান কেউ তো ডাকে না কাছে।

কেউ তো কয় না,

আয় বকুল তোর চুল বাইন্ধা দেই।

আয়, বকুল, আলতা দেই রাঙা দুইখান পায়।



Sunday, December 12, 2021

মুক্তি যুদ্ধের রনাঙ্গনের অকুতোভয় নারী নেত্রী রওশন আরা বেগম নীলার সংগ্রামী জীবন ...!!

মুক্তি যুদ্ধের রনাঙ্গনের অকুতোভয় নারী নেত্রী রওশন আরা বেগম  নীলার সংগ্রামী জীবন.......

 ©®✒️✒️ফারহানা হৃদয়িনী







বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের প্রচুর অবদান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। 

"শত শত্রুর প্রতিরোধ রুখতে পারে নি তাদের,করতে পারে নি যাদের চেতনার ক্ষয়।নিঃশ্বাসে বারুদের গন্ধ, বুকে প্রত্যয়।ছিল না যাদের কোন প্রাণ হারাবার ভয়।

তাদের চেতনায় শুধু লাল সবুজের পতাকা উড়েছে, তারা রক্তদিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র গড়েছে। তারা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা,তারা আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা এনেছে।"


তেমনি একজন সংগ্রামী নারী কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রওশন আরা বেগম নীলা। যিনি এমন একজন নারী যে দেশপ্রেমকে রক্তে প্রবাহিত করে এগিয়ে চলেছেন ১৯৬৮ সাল থেকে স্বাধীকার, স্বাধীনতা,অসহযোগ আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। আজ পর্যন্ত নারী মুক্তি, নারী কল্যান নারী সংগ্রাম,যৌতুক,বাল্যবিবাহ,ইভটিজিং প্রতিরোধ, ও নারীদের সার্বিক জীবনধারার উন্নয়ণে সংগ্রামী নারী রওশন আরা বেগম নীলা রাজপথের চির জাগ্রুক সৈনিক। 

 কুৃমারখালীর মত মফস্বল শহরে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে নারীরা যে ভূমিকা রেখেছিল তা অনেক জেলার নারীরা রাখেন নি। সেই সব সংগ্রামী নারী আজ অনেকেই হয়তো রাজপথ হতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু রওশন আরা বেগম  নীলা একনিষ্ঠ ভাবে কাজ  করে চলেছেন। 



তাঁর বাবার চাকরি সূত্রে বগুড়া জেলার শান্তাহারে অবস্থান কালীন সময়ে ১৯৫৪ সালের ৬ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।  ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে রওশন আরা নীলার রাজনীতি জীবনের শুরু। তিনি তখন কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। সে সময় কুমারখালী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক রেজাউল করিম হান্নানের অনুপ্রেরণায় তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৬৮-৬৯ সালে প্রায় প্রতিটি মিটিং-মিছিলে যোগ দিতেন। তখন বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা ও ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে কুমারখালীতে আন্দোলন সংগ্রাম চলছিল। প্রতিটি মিছিলে তিনি সামনে থেকে স্লোগান দিতেন। ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’, আপোস না সংগ্রাম-সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো,জয় বাংলা’ প্রভৃতি স্লোগানে প্রতিদিন কুমারখালী শহর মুখরিত হতো।




১৯৭১ সালে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিকামী মানুষদের সঙ্গে পাকহানাদার আর রাজাকারদের রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ। সেই সময় তিনি মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে গ্রেনেড  হামলা ও মেশিনগান পরিচালনার ট্রেনিঙ গ্রহণ করেন। সেই সময় বোরকা পরে পথে পথে ঘুরে যুদ্ধকালীন সময়ের খবর সংগ্রহ করে, মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে চিরকূট ও চিঠি পাঠিয়ে রাজাকার ও পাক হানাদারদের অবস্থান সম্বন্ধে খবর পাঠাতেন। তাই যুদ্ধকালীন সময়ে রওশন আরা বেগম নীলা সব সময় রাজাকারদের হুমকি ধমকিতে থাকতেন। একদিন রাতে রাজাকাররা তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। এক রাজাকার রাইফেল তাক করে তার বুকে। সেই মুহুর্তে তার বাবা অনেক অনুনয় বিনয় করেন তাকে ছেড়ে দেবার জন্য। এর মধ্যে একজন রাজাকার তাঁর সহপাঠী হওয়ায় তাকে সেদিনের মতো মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন। 

 ১৩৭০ বঙ্গাব্দে (১৯৬৯) কুমারখালী জে এন হাই স্কুলে নির্মিত কুমারখালীর প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেরও অন্যতম রূপকারও তিনি।



সমাজিক উন্নয়নে  বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য মহীয়সী এ নারী সরকারীভাবে কুমারখালী উপজেলা ও কুষ্টিয়া জেলার শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে  বেগম রোকেয়া দিবসে "জয়িতা" পদকে ভূষিত হয়েছেন।




মহীয়সী এ নারী এখন নিরন্তর ছুটে চলেছেন সমাজের অসহায় পিছিয়ে পড়া, সুবিধা বঞ্চিত হতদরিদ্র নারীদের কল্যাণে। বাল্যবিয়ে বন্ধ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এ নারী দিন নেই রাত নেই আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন পাশাপাশি সামাজিক,সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধের ওপর যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের নানাভাবে সহযোগিতা, পরামর্শ দান করে যাচ্ছেন। 







Friday, December 10, 2021

কবি ও চিত্রশিল্পী শেখ রবিউল হক (শিল্পী থেকে শিল্পপতি; শিল্পপতি থেকে শিল্পী।) ✒️✒️রেফুল করিম

ছবিওয়ালা রবি (শেখ রবিউল হক)

শিল্পী থেকে শিল্পপতি; শিল্পপতি থেকে শিল্পী।

✒️✒️রেফুল করিম






সব জীবনই বোধহয় কোনো না কোনভাবে সৃজনশীলতার পরীক্ষা দিয়ে চলে। আর জীবন কে উজানের দিকে নিয়ে যাওয়া মানেই তো শিল্পিতভাবে বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকাটা কারো কারো কাছে শুধুই জাগতিক হিসেব নয়। অতিসংবেদি মন নিয়ে তারা বোঝে জীবন শুধু এই মাটি - পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয় - তা দূর নক্ষত্রের সঙ্গে বোঝা পড়া করে চলে।




 তখন চোখের কাছে দেখা সুন্দর একটা ভিন্ন মাত্রা পায়।বিষয়টি বোধহয় আরেকটু বিশ্লেষিত হওয়া দরকার। দুচোখ মেলে যা দেখা যায় তাকে চিত্রিত করা শিল্প নয়।অতিসংবেদিত শিল্পী মনে যে দূরের ইশারা আছে, তার কোনো সংকেত যুক্ত করতে হয় শিল্পে।দৃশ্য গ্রাহ্য একান্ত বাস্তবের মধ্যে একটা অধরা মায়া আছে। সেই মায়ার খোঁজে নিতে চান শিল্পী শেখ রবিউল হক। তিনি পেশায় শিল্পী নন; কিন্তু শিল্পী হয়ে বাঁচতে চান। নিজের অস্তিত্বে তিনি অনুভব করেন সেই অধরা সুন্দরের টান। তাকে মায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে শিল্পের কুহক৷ 





শেখ রবিউল হকের  শিল্পচর্চার সূচনা শৈশবে। দেশি পেন্সিল ও দেশি রং দিয়ে তখন কোন মঞ্চ সজ্জার কাজে দক্ষতা  প্রমাণ করেন৷  তারপর বিষয় চিত্রিত করার সুখ তাকে শিল্পের নতুন নতুন দিগন্ত স্পর্শ করার প্রণোদনা দেয়৷ তাই তিনি জলরঙের  ললিত  ভাবটা বুঝে ছবি আঁকেন এবং তেল রঙের গাঢ় স্বভাবটা উপলব্ধি করে চিত্র রচনায় মনেনিবেশ করেন৷ কখনো বাস্তববাদী রীতি মেনে একাডেমির ব্যাকরণ  অনুসরণ করে ছবি আঁকেন, কখনো বা ছবি ছবি তৈরি হয়েছে দ্বিমাত্রিক নকশাধর্মিতায় জোর দিয়ে৷ 




শেখ রবিউল হক শিল্পী থেকে শিল্পপতি, শিল্পপতি থেকে শিল্পী। তাঁর পেশা আবাসন শিল্প। বানিজ্যের লক্ষী বসত করে। লক্ষীর সঙ্গে স্বরস্বতীর যুগলবাসেই জীবন পূর্ণতা পায়- একথা পৌরাণিক কাল থেকে বহুবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বৈভবের  কাছে এলে অনেক সময়ই মানবতাবোধ ও শিল্পবোধ জীবন থেকে লুপ্ত হয়ে যায়।শেখ রবিউল হকের সুন্দরের সুষমায় স্নিগ্ধজীবন প্রত্যাশা করেন এবং সে পথেই নিবিড় নিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে ও বিদেশে তিনি প্রচুর শিল্পীর সঙ্গে মেলামেশা করে চিত্র রচনায়র গূঢ় অর্থ বুঝাতে চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ছবি পাঠ করে বুঝতে চেয়েছেন সৃজনশীলতার মর্ম। ছবি আঁকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা  এবং এ আকাঙ্ক্ষাকে ফলবতী করার জন্য নিজের মতো করে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এই শিল্পী। বানিজ্য সফল শেখ রবিউল হকের জীবন শিল্পের সুফলতা ও সফলতা অন্বেষণ করে চলেছে। 




নিসর্গের গীতময় প্রকাশ আর মানুষের অনাবিল ও স্নিগ্ধ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন এই স্বশিক্ষিত শিল্পী। অপেশাদার ও নিজস্ব  অনুশীলনে যারা শিল্পী হয়ে ওঠেন তারা বিচিত্র বিষয় আঁকেন। তাছাড়া তাদের ভাষাও হয় বিচিত্র রকমের। যেখানে পেশাদার ও একাডেমি শিক্ষিত  শিল্পী  কতগুলো রীতিমাফিক পর্ব অতিক্রম করে নিজের বিষয় ও শিল্প ভাষায় স্হির হন,  সেখানে স্বশিক্ষিত শিল্পী কখনোই একক কোনো ধারা অনুসরণ করতে চান না। একারণেই হয়তো শেখ রবিউল হকের ছবিতে একই সঙ্গে একাডেমিক রিয়ালিজম, ইস্প্রেশনইজম, অ্যাবাস্ট্র্যাকট ইত্যাদি শিল্প রীতি প্রকাশ দেখা যায়। 




সুন্দরের প্রতি পক্ষপাত মানুষের স্বভাবের অন্তর্লীন বৈশিষ্ট্য। যদিও সংজ্ঞা সুন্দরের ব্যাখ্যা করতে গেলে সুন্দর কে আর সীমিত শর্তে সীমায়িত রাখা যাবেনা। তার অনেক সংজ্ঞা তৈরি হবে এবং ইতিমধ্যে অনেক সংজ্ঞাই তাত্বিকেরা নিরূপণ করেছে। তবুও তো প্রকৃতিতে সুন্দরের ধ্রুবক রয়ে গেছে। ফুল সুন্দর, শিশুমুখ সুন্দর অথবা ব্যাপ্ত করে যদি তবে বলতে হয় নিসর্গ, মানুষ ও প্রাণিকূল ইশ্বরের হিসেবে বা প্রকৃতির নিয়মের সুন্দরের প্রতিনিধি। এরকম ভাবন থেকে শেখ রবিউল হক ফুল এঁকেছেন, মানুষ, নিসর্গ দৃশ্য,নারী এবং ভাইবোনের সম্পর্কে গভীরে যে প্রীতি ও স্নেহ আছে, তা ও চিত্রায়িত করেছেন৷ 



শিল্পের একটা বড় বৈশিষ্ট্য উপরিতল দেখে বিষয়টির গভীরতাকে আবিস্কার করা।চোখের দেখা নয়, মনের অনুভবকে দৃশ্যায়িত করার মধ্য দিয়ে চিত্রকলা মাধ্যম প্রকাশের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। ' অক্সিজেন কারখানা ', ' তিনি একজন ',' নিটোল বন্ধুত্ব' এসব নামের ছবিতে শেখ রবিউল হক বিষয় ছাপিয়ে রং ও গড়নকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করিয়েছেন। এ ধরনের ছবিতে ফিগার থাকলেও তা রঙিন নিসর্গের চেয়ে বড় অবয়বে উপস্থাপিত হয়নি। রঙের বিমূর্ত এক চলাচল আছে। শেষে রং নিজের কথা বলবে। চিত্রকলা গভীরতর অর্থে রঙের সংলাপ বিনিময়, অনেক রঙের কাকলি,আলো- অন্ধকারের বুনট মাত্র। এই সত্য যে শেখ রবিউল হকের মর্ম ছুঁয়েছে, তা তার চিত্রকলার দিকে তাকালেই বোঝা যায়।